আওয়ামী লীগের গোপন বৈঠকের অভিযোগ পুলিশের, জাসদের দাবি কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভা। আটকদের থানায় নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর গুলিস্তানে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে ২৮০ জনকে থানায় নিয়ে গেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলা এ অভিযানে পুলিশ ভ্যানে তোলার সময় অনেককে হাতকড়া পরানো হয়। পরে তাঁদের পল্টন ও শাহজাহানপুর থানায় নেওয়া হয়। আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে গুলিস্তানে দিনভর উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পুলিশের দাবি, জাসদ কার্যালয়ের আড়ালে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা গোপন বৈঠক করছিলেন। অন্যদিকে জাসদের দাবি, সেখানে চলছিল দলটির পূর্বনির্ধারিত কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভা, যার বিষয়ে আগেই পুলিশকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছিল।
যুবদল নেতাকর্মীদের অবস্থান, এরপর পুলিশের অভিযান
এর আগে বেলা আড়াইটার দিকে জাসদ কার্যালয়ে যান যুবদলের নেতাকর্মীরা। তাঁদের অভিযোগ, জাসদ কার্যালয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের স্লোগান ও দলটির তৎপরতা চলছে। এরপর কার্যালয়ের সামনে স্লোগান দিতে থাকেন তাঁরা।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, জাসদ কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গোপন বৈঠকের খবর পেয়ে যুবদলের নেতাকর্মীরা সেখানে জড়ো হন এবং ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের আটকে রেখে পুলিশকে খবর দেন। এরপর পুলিশ সেখানে অভিযান চালায়।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সদস্যসচিব রবিউল ইসলাম নয়নকে জাসদ কার্যালয়ের সামনে স্লোগান দিতে দেখা যায়। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘জাসদ কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের স্লোগান দেওয়া হচ্ছে। তাহলে এটাকে জাসদের কার্যালয় বলা যায়? এটা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কার্যালয়। যেখানে আওয়ামী লীগের স্লোগান দেখব, সেখানেই যুবদল যাবে।
পুলিশের দাবি: জাসদের আড়ালে আওয়ামী লীগের বৈঠক
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেন, জাসদের আড়ালে দলটির কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের লোকজন গোপন বৈঠক করছিলেন—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান চালানো হয়। তাঁদের ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া যায়।
তিনি জানান, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ২৮০ জনকে থানায় নেওয়া হয়েছে। তাঁদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলছে।
জাসদ পুলিশের কাছে আগে সভার বিষয়ে আবেদন করেছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ডিসি হারুন অর রশিদ বলেন, সভার আবেদন যে কেউ দিতে পারেন; কিন্তু আবেদন করলেই অনুমতি হয়ে যায় না। পুলিশের দাবি, আবেদন দেওয়ার আড়ালে জাসদ কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের বৈঠক চলছিল।
জাসদের দাবি: এটি ছিল পূর্বনির্ধারিত প্রতিনিধি সভা
তবে পুলিশের অভিযোগ অস্বীকার করেছে জাসদ। দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ হিল কাইয়ুম বলেন, ডিএমপি কমিশনার, মতিঝিল জোনের ডিসি ও পল্টন থানার ওসিকে অবগত করেই কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভার আয়োজন করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, জাসদ নিষিদ্ধ দল নয় এবং দলটির কার্যক্রমের ওপরও কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভায় অংশগ্রহণকারীরা পরিচিত জাসদ নেতা ও সদস্য ছিলেন। সভায় আওয়ামী লীগ বা অন্য কোনো দলের কারও প্রবেশের সুযোগ ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি।
জাসদের এই নেতা জানান, সভায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা প্রায় ৫০০ বিভিন্ন স্তরের নেতা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩০ জন নারী ছিলেন। তাঁর দাবি, পুরো কার্যালয় ঘেরাও করে পরে সবাইকে বিভিন্ন থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
জাসদের নেতারা জানান, সকাল ১০টার পর দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে নেতারা গুলিস্তানে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসতে শুরু করেন। সাড়ে ১০টার পর প্রতিনিধি সভা শুরু হয়। মাইক ব্যবহার ও নিরাপত্তার জন্য ডিএমপি কমিশনার এবং মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার বরাবর বৃহস্পতিবার চিঠি দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি তাঁদের। এ বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২৪ সেপ্টেম্বর পুলিশের কাছে আবেদন দেওয়ার তথ্যও এসেছে।
পর্যায়ক্রমে ২৮০ জনকে থানায় নেওয়া
পুলিশ জানায়, দুপুর আড়াইটার দিকে পল্টন থানা পুলিশ জাসদ কার্যালয়ে অভিযান শুরু করে। এরপর একে একে ২৮০ জনকে কার্যালয় থেকে বের করে পল্টন ও শাহজাহানপুর থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সাবেক সভাপতি আবু জাফর সূর্যও ছিলেন বলে জাসদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বিকেল পৌনে ৫টার দিকে ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার আকতার হোসেন জানান, ওই কার্যালয়ের সামনে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে অভিযান চালায়।
‘প্রথমে হামলা, পরে আটক’—জাসদের অভিযোগ
জাসদের দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, তাঁদের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভা সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হয়েছিল। তাঁর দাবি, প্রথমে বিএনপির নেতাকর্মীরা সেখানে এসে জাসদের নেতাকর্মীদের মারধর করেন। ওই সময় পুলিশ সদস্যরাও সেখানে ছিলেন। পরে বিকেলে পুলিশ এসে নেতাকর্মীদের আটক করতে শুরু করে এবং পর্যায়ক্রমে সবাইকে নিয়ে যায়।
সাজ্জাদ হোসেন বলেন, জাসদ কার্যালয় থেকে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি আবু জাফর সূর্যকেও আটক করা হয়েছে। তিনি জাসদ সমর্থক হওয়ায় সভায় অংশ নিতে কার্যালয়ে এসেছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
বাসদের প্রতিবাদ
এ ঘটনায় বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।
বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে জাসদের প্রতিনিধি সভা চলাকালে পুলিশের অভিযানের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। একই সঙ্গে আটক ব্যক্তিদের মুক্তির দাবি করেন তিনি।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, মিছিল, মিটিং ও সমাবেশ করা নাগরিকের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার। গণতন্ত্রের মূল কথা সহনশীলতা ও পরমতসহিষ্ণুতা। তাঁর বক্তব্য, অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশ পণ্ড ও গ্রেপ্তারের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখা গেছে, বর্তমান সরকারের কাছ থেকে একই ধরনের আচরণ প্রত্যাশিত নয়।
এখন প্রশ্ন—কারা আটক, কী হবে তাঁদের?
জাসদ কার্যালয়ে পুলিশের অভিযানের পর আটক ২৮০ জনকে নিয়ে এখন চলছে যাচাই-বাছাই। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতা যাচাইয়ের পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে জাসদের দাবি, আটক ব্যক্তিরা দলটিরই নেতাকর্মী এবং তাঁরা পূর্বনির্ধারিত সাংগঠনিক সভায় অংশ নিতে এসেছিলেন।
ফলে একই ঘটনাকে ঘিরে পুলিশের অভিযোগ ও জাসদের বক্তব্যে তৈরি হয়েছে স্পষ্ট ভিন্নতা। আটক ব্যক্তিদের পরিচয়, তাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং যাচাই-বাছাই শেষে পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্টদের।
