রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে রাতের আঁধারে জবাইয়ের অভিযোগ, সাভার-আশুলিয়ায় তিন শতাধিক বাজারে নেই পর্যাপ্ত তদারকি। ফাইল ছবি
সপ্তাহজুড়ে কর্মব্যস্ততার পর ছুটির দিনের সকালে রাজধানী ও আশপাশের বাজারগুলোতে জমে ওঠে মানুষের ভিড়। প্রিয়জনের মুখে একটু ভালো খাবার তুলে দিতে কসাইয়ের দোকানের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে পছন্দের মাংস কিনে বাসায় ফেরেন ক্রেতারা। কিন্তু যে মাংসটি রান্না হয়ে পরিবারের খাবারের টেবিলে উঠছে, সেটি আসলেই কতটুকু ভালো কিংবা স্বাস্থ্যসম্মত—তার নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না কেউই।
অভিযোগ রয়েছে, খাসির মাংসের নামে হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে ভেড়ার মাংস। ষাঁড়ের কথা বলে গছিয়ে দেওয়া হচ্ছে অসুস্থ কিংবা বুড়ো গাভীর মাংস। এমনকি আগের দিনের পচা-বাসি মাংসও নতুন মাংসের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করার অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজার থেকে শুরু করে সাভার ও আশুলিয়ার বাজারগুলোতে এমন অনিয়ম যেন অনেকটাই নিয়মে পরিণত হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, পশু জবাইয়ের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে সুস্থ পশুর মাংসে সরকারি সিলমোহর দেওয়ার বিধান থাকলেও বাস্তবে সেই ব্যবস্থা অনেক জায়গাতেই কার্যত অনুপস্থিত। ফলে ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর আগেই মাংসের নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের প্রশ্ন।
সাভার ও আশুলিয়া অঞ্চল মিলিয়ে প্রায় তিন শতাধিক মাঝারি ও বড় বাজার রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী পশু জবাইয়ের আগে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কাছ থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে সিলমোহর দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই সেই তদারকি নেই বললেই চলে। সরকারি ভেটেরিনারি সার্জনদের নিয়মিত পরিদর্শন ও পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারিও দুর্বল।
ফলে সাভার-আশুলিয়ার হাজার হাজার রেস্তোরাঁ ও সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে প্রতিনিয়ত পৌঁছে যাচ্ছে অনিরাপদ ও স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ মাংস। একই সঙ্গে রোগাক্রান্ত পশুর মাংসের মাধ্যমে অ্যানথ্রাক্সের মতো প্রাণঘাতী ব্যাকটেরিয়ার স্পোর মানুষের ঘরেও পৌঁছে যেতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
রাজধানীর বাজার থেকে সাভারের কসাইখানা—নেই স্বাস্থ্য পরীক্ষার নিশ্চয়তা
সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন বাজার সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কসাইখানা না থাকায় খোলা জায়গায় নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই পশু জবাই এবং মাংস কাটাকাটি চলছে। পৌর এলাকায় একটি কসাইখানা থাকলেও সেখানে নেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও পর্যাপ্ত অবকাঠামো। ইউনিয়ন পর্যায়ে কোথাও কোথাও নির্দিষ্ট কসাইখানা বা স্লটার হাউসের ব্যবস্থাও নেই।
এমনকি সাভার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের মাধ্যমে নিয়মিত পশু স্বাস্থ্য পরীক্ষা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। ফলে কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা যাচাই-বাছাই ছাড়াই রাতের আঁধারে পশু জবাইয়ের অভিযোগও উঠেছে।
অন্যদিকে অপরিচ্ছন্ন জবাইখানা ও কসাইখানার পরিবেশে মাংস কাটাকাটির কারণে ফিকেল ব্যাকটেরিয়াসহ বিভিন্ন প্যাথোজেনিক জীবাণু মাংসে ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরে সেই মাংস মানুষের রান্নাঘরে পৌঁছে খাদ্যবাহিত অসুস্থতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
‘খাসি’ কিনে ভেড়া, ‘ভালো গরু’ কিনে বুড়ো গাভী
বলিবদ্র বাজারে মাংস কিনতে আসা রফিকুল ইসলাম নামে এক চাকরিজীবী আক্ষেপ করে বলেন, ‘সপ্তাহের ছুটির দিনে পরিবারের সবাইকে নিয়ে একটু ভালো খাওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে মাংস কিনি। কিন্তু খাসি বললে ধরিয়ে দেয় ভেড়া। আর ভালো গরুর কথা বলে বুড়ো গাভী বা মরা গরুর মাংস দেয়। খোলা জায়গায় কাটাকাটি হয়, বোঝার কোনো উপায় থাকে না।
সাভার নামাবাজারের গৃহিণী শারমিন আক্তার বলেন, ‘মাংসের সঙ্গে রক্ত মাখানো পচা-বাসি মাংস বা অতিরিক্ত চর্বি মিশিয়ে দেওয়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা। বাজারে কসাইদের তদারকি করার কেউ নেই। যার যেভাবে খুশি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের জিজ্ঞাসা করলে বলে আজকেই জবাই করা হয়েছে। আমরা বুঝব কিভাবে কোনটা ভালো বা খারাপ। বাধ্য হয়ে কিনতে হচ্ছে গরুর মাংস।
আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকার এক রেস্তোরাঁ মালিক হাসান জানান, নির্দিষ্ট কসাইখানা কিংবা সরকারি সিল দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে কসাইদের দেওয়া মাংসই কেনেন। মাংসের মান খারাপ হলে দুর্নাম হয় তাদের, আর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন সাধারণ মানুষ।
রাজধানীর মিরবাগ-কাপ্তান বাজার-শনিরআখড়াতেও রাতের জবাই!
শুধু সাভার-আশুলিয়া নয়, রাজধানীর মিরবাগ, কাপ্তান বাজার, শনিরআখড়া ও হাজারীবাগসহ বিভিন্ন এলাকা থেকেও রাতে পশু জবাই করে বিভিন্ন খুচরা কসাইয়ের দোকানে মাংস সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে। এসব মাংসের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, জবাইয়ের পরিবেশ কিংবা সরকারি সিলমোহর—কোনো বিষয়েই নিয়মিত তদারকি চোখে পড়ে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
ফলে রাজধানীর লাখো মানুষের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় যে মাংস ঢুকছে, সেটি সুস্থ পশুর কি না, কখন জবাই করা হয়েছে, কোথায় জবাই হয়েছে কিংবা কতক্ষণ ধরে সংরক্ষণ করা হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর অনেক ক্ষেত্রেই অজানা থেকে যাচ্ছে।
‘একজন ভেটেরিনারি সার্জন দিয়ে ২০ লাখ মানুষের চাহিদা সামলানো দুরূহ’
সাভার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সেলিম জাহান জানান, সাভারের প্রায় ২০ লাখ জনসংখ্যার বিপরীতে সরকারি অর্গানোগ্রামে মাত্র একজন ভেটেরিনারি সার্জন রয়েছেন। এ বিশাল জনসংখ্যার জন্য প্রতিদিন যে পরিমাণ পশু জবাই হয়, তা এককভাবে পরীক্ষা করে সার্টিফিকেট দেওয়া অত্যন্ত দুরূহ কাজ।
এ ছাড়া পৌরসভাতেও ভেটেরিনারি সার্জন পদ শূন্য রয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নে আধুনিক কসাইখানা স্থাপন, পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা এবং ভেটেরিনারি সার্জনসহ প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগের ওপর জোর দেন তিনি।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ভাষ্য
ঢাকা জেলা কার্যালয়ের নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল ইসলাম জানান, পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও জবাইপূর্ব তদারকির প্রাথমিক দায়িত্ব প্রাণিসম্পদ দপ্তরের। তবে জবাইকৃত পশু যখন প্রক্রিয়াজাত হয়ে খাদ্য বা মাংস হিসেবে বাজারে আসে, তখন নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারে।
কোনো নির্দিষ্ট ও সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে তাৎক্ষণিক যৌথ অভিযান চালিয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
আধুনিক কসাইখানা তৈরির পরিকল্পনা
সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম জানান, সাভার পৌরসভায় একটি কসাইখানা থাকলেও সেখানে স্থায়ী অবকাঠামো নেই এবং এটি ইজারা দেওয়া থাকে। কসাইখানার জন্য নির্ধারিত ‘কসাইখানা ইন্সপেক্টর’ পদটিও বর্তমানে শূন্য রয়েছে।
পৌরসভার শূন্য পদগুলোতে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং কসাইখানার অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা চলছে। তা ছাড়া সাভারের বিশাল জনসংখ্যার চাহিদা বিবেচনায় ইউনিয়ন পর্যায়েও ছোট ছোট ‘স্লটার হাউস’ বা কসাইখানা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
একই সঙ্গে খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টাস্কফোর্সের মাধ্যমে মাংসের বাজারগুলোতে নিয়মিত নজরদারি জোরদার করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়।
অ্যানথ্রাক্সের ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য ও ইনফরম্যাটিক্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আয়েশা আহমেদ বলেন, স্থানীয় খোলা বাজারগুলোতে যে কাঁচা মাংস আসছে, তার কোনো স্বাস্থ্যগত নিশ্চয়তা নেই। সুস্থ পশু জবাই করা হচ্ছে কি না বা এর কোনো বৈজ্ঞানিক সার্টিফিকেশন হচ্ছে কি না, তা জানার কোনো উপায় নেই।
তিনি বলেন, অ্যানথ্রাক্স একটি অত্যন্ত মারাত্মক স্পোর-ফর্মিং ব্যাকটেরিয়া। এই স্পোর সহজে ধ্বংস হয় না এবং এগুলো দূর করতে উচ্চ তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। কোনো খামারে অ্যানথ্রাক্স দেখা দিলে পুরো খামার জীবাণুমুক্ত বা স্টেরিলাইজ করতে হয়। ফলে পরীক্ষা ছাড়া আসা মাংস স্পোরমুক্ত কি না, তা ভোক্তারা জানতে পারছেন না। তাই মাংস পরীক্ষার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি।
প্রশ্ন এখন একটাই—মাংসের নামে আসলে কী পৌঁছাচ্ছে মানুষের প্লেটে?
রাজধানী ও এর আশপাশের কোটি মানুষের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় মাংস একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অথচ জবাইয়ের আগে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, জবাইয়ের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত স্থান, সরকারি সিলমোহর, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ—প্রতিটি ধাপেই যদি তদারকির ঘাটতি থাকে, তাহলে ভোক্তার নিরাপদ মাংস পাওয়ার অধিকারটি কোথায়?
খাসির নামে ভেড়া, ভালো গরুর নামে বুড়ো গাভী, পুরোনো মাংসের সঙ্গে নতুন মাংস মেশানো কিংবা পরীক্ষা ছাড়াই পশু জবাইয়ের অভিযোগ শুধু প্রতারণার প্রশ্ন নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। তাই রাজধানী ও সাভার-আশুলিয়ার মাংসের বাজারে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সরকারি সিলমোহর, আধুনিক কসাইখানা এবং কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে।
