জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট
রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল-এ ইলেক্ট্রো ফিজিওলজি স্টাডি (ইপিএস) করাতে গিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার মুখে পড়ছেন হৃদরোগীরা। হৃদযন্ত্রের জটিল বৈদ্যুতিক সমস্যার কারণ শনাক্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই পরীক্ষার জন্য রোগীদের অনেক ক্ষেত্রে এক থেকে দেড় বছরেরও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সরকারি পর্যায়ে ইপিএস সেবা সীমিত হওয়ায় রোগীর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে যাচ্ছেন, যেখানে একই পরীক্ষার খরচ ৬৫ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত। অথচ জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে এই পরীক্ষার ব্যয় সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ।
এক ল্যাবে হাজারো রোগীর ভরসা
২০১৮ সালে হাসপাতালটিতে একটি মাত্র ইপিএস ল্যাব চালু হয়। বর্তমানে সপ্তাহে মাত্র একদিন এই পরীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ফলে দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে অপেক্ষমাণ রোগীর তালিকা।
চিকিৎসকদের আশঙ্কা, প্রায় আট বছর ধরে টানা ব্যবহৃত একমাত্র ইপিএস মেশিনটি যে কোনো সময় বিকল হয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন ল্যাব ও যন্ত্রপাতি সংযোজন এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০২৮ সালের সিরিয়াল, হতাশ রোগীর স্বজন
রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের আলিনগর খালপাড় এলাকার বাসিন্দা এনায়েত হোসেন তাঁর স্ত্রীকে তীব্র বুকব্যথা ও অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দনের সমস্যার কারণে গত ১১ মে হাসপাতালে ভর্তি করান। চিকিৎসকরা ইপিএস পরীক্ষার পরামর্শ দিলেও হাসপাতাল থেকে তাঁকে দেওয়া হয়েছে ২০২৮ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহের সিরিয়াল।
ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমি ভ্যানে করে পাঞ্জাবি বিক্রি করি। সংসার চালাতেই কষ্ট হয়। এতদিন অপেক্ষা করা সম্ভব নয়, আবার বেসরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা করানোর সামর্থ্যও নেই।
একই সংকটের মুখে পড়েছেন চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের বাসিন্দা বাবুল মিয়া। স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসে তিনি জানতে পারেন, দ্রুত পরীক্ষা করাতে হলে বেসরকারি হাসপাতালই একমাত্র বিকল্প। তাঁর ভাষায়,
“সরকারি হাসপাতালে সময়মতো চিকিৎসা পেলে এত বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে চিন্তা করতে হতো না। ৯৫ হাজার টাকা জোগাড় করা আমার পক্ষে অসম্ভব।
গুরুত্বপূর্ণ এই ইপিএস পরীক্ষা কী?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ইলেক্ট্রো ফিজিওলজি স্টাডি (ইপিএস) হলো হৃদযন্ত্রের বৈদ্যুতিক কার্যক্রম বিশ্লেষণের একটি বিশেষায়িত পরীক্ষা। বুক ধড়ফড় করা, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন কিংবা হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো জটিল সমস্যার কারণ নির্ণয়ে এটি অত্যন্ত কার্যকর।
প্রতিদিনই বাড়ছে চাপ
গত মঙ্গলবার দুপুরে হাসপাতালের ৩৩৪ নম্বর কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, সিরিয়াল নেওয়ার জন্য রোগী ও স্বজনদের উপচে পড়া ভিড়। দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ও কর্মচারীরা বাড়তি চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
রোগী পলি বেগমের স্বজন জানান, তারা আগামী বছরের জুলাই মাসের জন্য সিরিয়াল পেয়েছেন। তাদের অভিযোগ, স্বল্প খরচে চিকিৎসার আশায় সরকারি হাসপাতালে এলেও শেষ পর্যন্ত আর্থিক ও মানসিক চাপে পড়তে হচ্ছে।
প্রয়োজন নতুন ল্যাব ও জনবল
সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের মতে, রোগীদের ভোগান্তি কমাতে দ্রুত অন্তত আরও একটি বা দুটি ইপিএস ল্যাব স্থাপন করা জরুরি। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ানের সংখ্যা বাড়ানো গেলে অস্ত্রোপচার ও পরীক্ষার সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে জরুরি রোগীদের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক সেবা চালু রাখা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের আশ্বাস
হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী বলেন, আমাদের যন্ত্রপাতির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তারপরও সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। নতুন একটি ইপিএস মেশিন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি চালু করা গেলে রোগীদের অপেক্ষার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
হৃদরোগীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সেবায় দীর্ঘ অপেক্ষা এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন ল্যাব ও আধুনিক যন্ত্রপাতি দ্রুত সংযোজন না হলে ভবিষ্যতে সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
