বুধবার, ৩রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ডিএসসিসির অন্দরে ‘অদৃশ্য সিন্ডিকেট’? বরখাস্ত কিবরিয়া, পদোন্নতিতে বিতর্কে আহসান হাবীব

স্টাফ রিপোর্টার
জুন ২, ২০২৬ ১১:৪৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রকৌশল ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাত ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অভিযোগ ঘুরপাক খাচ্ছে। সম্প্রতি নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়ার সাময়িক বরখাস্তের পর সেই আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে—যেখানে এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেখানে একই অভিযোগের পরিসরে আলোচিত আরেক কর্মকর্তা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসান হাবীব কীভাবে পদোন্নতি পেলেন?

ডিএসসিসির অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সূত্র ও অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকৌশল, উন্নয়ন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী প্রভাব বলয় কাজ করছিল। অভিযোগ রয়েছে, এই বলয়ের মাধ্যমে টেন্ডার প্রক্রিয়া, প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিল অনুমোদন, কাজের মান নির্ধারণ এবং অর্থ ছাড়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

অভিযোগ অনুযায়ী, সাময়িক বরখাস্ত হওয়া নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া এবং বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসান হাবীবকে ঘিরেই গড়ে ওঠে এই প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।

টেন্ডারে কারসাজির অভিযোগ-

অভিযোগকারীদের দাবি, দরপত্রের শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হতো যাতে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সহজেই সুবিধা পায় এবং প্রকৃত প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে পড়ে। এর ফলে সরকারি অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার আগেই বিল পরিশোধ, নিম্নমানের কাজ অনুমোদন এবং কাজের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও অর্থ ছাড়ের অভিযোগও রয়েছে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কোটি টাকার প্রশ্ন-

রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করেও একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের মতে, জ্বালানি ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

কিছু ক্ষেত্রে ভুয়া লগবই ব্যবহার করে অতিরিক্ত ট্রিপ দেখিয়ে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে এখনো প্রকাশ্যে শক্ত প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি।

পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জনবল ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কাগজে-কলমে থাকা কর্মী সংখ্যা এবং বাস্তবে কর্মরত জনবলের মধ্যে অসঙ্গতি থাকতে পারে। উপস্থিতি রেকর্ড, বেতন প্রদান এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায়ও স্বচ্ছতার ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে।

সরঞ্জাম ক্রয়ে অনিয়ম?

ডাস্টবিন, কনটেইনার, বর্জ্য পরিবহন যান এবং অন্যান্য সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে বাজারদরের তুলনায় বেশি দামে সরঞ্জাম কেনা হয়েছে কিংবা নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ করা হয়েছে। এমনকি নির্দিষ্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব বিষয় এখনো তদন্তাধীন এবং কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ হয়নি।

বহিষ্কার মুস্তানজির, বিতর্কে সম্পর্কের প্রশ্ন :

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ডিএসসিসির আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা (উপসচিব) কাজী সালেহ মুস্তানজিরকে বহিষ্কার করা হয়।

অভিযোগকারীদের দাবি, তার সঙ্গে আহসান হাবীবের ঘনিষ্ঠ প্রশাসনিক সম্পর্ক ছিল এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্তে তাদের সমন্বিত ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

সাংবাদিকদের প্রশ্নে নীরবতা-

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব সাংবাদিকদের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলতে রাজি হননি। অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে, তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা আমার বাসায় চলুন। পরে আর কোনো মন্তব্য না করে সেখান থেকে চলে যান।

বরখাস্ত কিবরিয়া, পদোন্নতিতে আহসান—প্রশ্নের মুখে প্রশাসন

সম্প্রতি জারি করা এক দপ্তর আদেশে নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তার বিরুদ্ধে মার্কেট পরিচালনা, দোকান বরাদ্দ, টেন্ডার কার্যক্রমসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে।

কিন্তু একই সময়ে আলোচিত আরেক কর্মকর্তা আহসান হাবীবের পদোন্নতি প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—যদি অনিয়মের অভিযোগে একজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তবে একই অভিযোগের পরিসরে থাকা অন্যদের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?

স্বাধীন তদন্তের দাবি-

নাগরিক সমাজের একাংশ এবং সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ডিএসসিসির প্রকৌশল ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতের পুরো কার্যক্রম একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশনের মাধ্যমে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

তাদের মতে, প্রকৃত সত্য উদঘাটন, দায় নির্ধারণ এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের কোনো বিকল্প নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর টেন্ডার প্রক্রিয়া, রিয়েল-টাইম মনিটরিং, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের অভিযোগ অনেকাংশে কমে আসতে পারে।

সব মিলিয়ে ডিএসসিসির প্রকৌশল ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো এখনো তদন্ত ও পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং দায় নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপের দিকেই এখন তাকিয়ে আছে নগরবাসী।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় পানি উন্নয়ন বোর্ড, রংপুর কার্যালয়। প্রশাসনিক কাঠামো অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন ও তদারকির দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীর ওপর বর্তায়। এই প্রেক্ষাপটে রবিউল ইসলামের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠতে থাকে। স্থানীয় কিছু বাসিন্দা ও সামাজিক সংগঠনের দাবি, প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নে শুরু থেকেই অনিয়ম দেখা গেছে। তাদের অভিযোগের মধ্যে অন্যতম হলো—কাজের মান নিম্নমানের, খাল খননের ক্ষেত্রে আধুনিক ও কার্যকর যন্ত্রপাতির পরিবর্তে অপ্রতুল পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে এবং খনন করা মাটি সঠিকভাবে অপসারণ না করে পুনরায় খালেই ফিরে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, কিছু সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খালের দুই পাশে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ না করেই প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়েছে, যার ফলে প্রকৃত খনন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পরিবেশবিদদের মতে, শুধু খনন কাজ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়, বরং খালের সঙ্গে সংযুক্ত নদী প্রবাহ পুনরুদ্ধার, দখল উচ্ছেদ এবং সমন্বিত নগর পরিকল্পনা প্রয়োজন। এই মতামতের সঙ্গে একমত পোষণ করে স্থানীয় একাধিক নাগরিক সংগঠনও দাবি করেছে যে প্রকল্পটি কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না।

প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত ঠিকাদারদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে যে মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি সাব-কনট্রাক্টের মাধ্যমে অন্য একটি পক্ষকে দিয়ে বাস্তবায়ন করছে। এই সাব-কনট্রাক্টর আহসানুল হক মুকুল নামের একজন ব্যক্তি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তিনি দাবি করেছেন, তিনি নিয়ম মেনে কাজ করছেন এবং কোনো ধরনের গাফিলতি করা হয়নি। তবে স্থানীয় পর্যায়ে কাজের অগ্রগতি ও মান নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।