বুধবার, ১০ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৭শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

দুই দপ্তরে একক আধিপত্য, চাকরির আড়ালে কোটি টাকার ঠিকাদারি! প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে কবির উদ্দীনের ‘অপ্রতিরোধ্য সাম্রাজ্য’ নিয়ে তোলপাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক
জুন ৯, ২০২৬ ১০:১১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

একজন নন-ক্যাডার কর্মকর্তা। পদবি সহকারী পরিচালক। কিন্তু অভিযোগের পরিধি যেন একজন কর্মকর্তার সীমা ছাড়িয়ে এক প্রভাবশালী ক্ষমতার বলয়ে রূপ নিয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (গোট ফার্মস) ডা. মো. কবির উদ্দীনের বিরুদ্ধে ওঠা একের পর এক অভিযোগ এখন অধিদপ্তরজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে। দুই দপ্তরে একযোগে দায়িত্ব পালন থেকে শুরু করে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ঠিকাদারি ব্যবসা, চাঁদাবাজি, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার এবং বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগে প্রশ্নের মুখে পড়েছে তার দীর্ঘদিনের কর্মকাণ্ড।

দুই দপ্তরে এক ব্যক্তি, কোথায় প্রশাসনিক জবাবদিহিতা?

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নারায়ণগঞ্জ জেলা ভেটেরিনারি হাসপাতালে কর্মরত থাকলেও একইসঙ্গে তিনি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উৎপাদন শাখার সহকারী পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে একই এলাকায় অবস্থান করে তিনি এমন এক প্রভাববলয় গড়ে তুলেছেন, যা নিয়ে খোদ অধিদপ্তরের ভেতরেই নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

সরকারি চাকরির নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর বদলির বিধান থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, প্রায় দেড় দশক ধরে একই এলাকায় অবস্থান করে নিজের কর্তৃত্ব অটুট রেখেছেন তিনি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই উঠছে প্রশ্ন—কার ছত্রচ্ছায়ায় এই দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান?

চাকরির আড়ালে ঠিকাদারি সাম্রাজ্য?

অভিযোগ আরও বিস্ফোরক। সরকারি চাকরিতে বহাল থেকেও নিজের প্রতিষ্ঠান মেসার্স এস কে ট্রেডার্স-এর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পে কোটি কোটি টাকার কাজ নিয়ন্ত্রণ করছেন ডা. কবির উদ্দীন।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকল্প পরিচালকদের ওপর প্রভাব খাটিয়ে কার্যাদেশ আদায়, পছন্দের ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়া এবং গভীর রাত পর্যন্ত অফিস খোলা রেখে টেন্ডার ও প্রকল্পসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ বহুদিনের। প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি কর্মকর্তা হয়ে কীভাবে ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততা সম্ভব?

টেন্ডার সিন্ডিকেটের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক?

একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের অন্যতম নিয়ন্ত্রক ডা. কবির। অভিযোগ অনুযায়ী, অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ টেন্ডার প্রক্রিয়ায় এই সিন্ডিকেটের প্রভাব এতটাই শক্তিশালী যে সাধারণ ঠিকাদাররা প্রতিযোগিতায় টিকতেই পারেন না।

অভিযোগকারীদের ভাষায়, “অনেক টেন্ডারের ফল আগেই নির্ধারিত থাকে, শুধু আনুষ্ঠানিকতা বাকি থাকে।”

যদি এসব অভিযোগ সত্য হয়, তবে কোটি কোটি টাকার সরকারি কাজের স্বচ্ছতা নিয়েই বড় প্রশ্ন দেখা দেয়।

রাজনৈতিক অনুষ্ঠান ও দিবসের নামে কোটি টাকার চাঁদাবাজি?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের নামে প্রকল্প ও দপ্তর থেকে নিয়মিত অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে।

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি হলো, সাম্প্রতিক বিশ্ব ভেটেরিনারি দিবস উপলক্ষে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে প্রায় ৫০ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ। যদিও এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

খামারিদের জন্য বরাদ্দ ওষুধ গেল কোথায়?

নারায়ণগঞ্জ জেলা ভেটেরিনারি হাসপাতালের জন্য বরাদ্দকৃত ওষুধ ও ভিটামিন বিনামূল্যে বিতরণের কথা থাকলেও স্থানীয় খামারিদের অভিযোগ, বাস্তবে অনেকেই সেই সুবিধা পাননি।

বরং অভিযোগ উঠেছে, এসব সরকারি সামগ্রী ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার বা বিক্রির মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিতরণ রেজিস্টার ও প্রকৃত উপকারভোগীদের তালিকা যাচাই করা হলে অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।

৯ম গ্রেডের কর্মকর্তা, অথচ সম্পদের পাহাড়!

অভিযোগের তালিকায় রয়েছে অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের বিষয়টিও। সংশ্লিষ্টদের দাবি, একজন ৯ম গ্রেডের নন-ক্যাডার কর্মকর্তা হয়েও ঢাকায় বাড়ি, নারায়ণগঞ্জে জমিসহ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন ডা. কবির উদ্দীন।

এই সম্পদের উৎস কী, তা নিয়ে অধিদপ্তরের ভেতরে-বাইরে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো তদন্তের খবর পাওয়া যায়নি।

রাজনৈতিক পরিচয় বদলে টিকে থাকার অভিযোগ

অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেন, সময় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী রাজনৈতিক পরিচয় বদলে নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করে প্রশাসনিক প্রভাব ধরে রেখেছেন তিনি। ফলে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পান।

তাদের ভাষায়, কেউ মুখ খুললেই বদলি, হয়রানি কিংবা প্রশাসনিক চাপের আশঙ্কা থাকে।

অভিযোগের মুখে নীরবতা, বাড়ছে রহস্য

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে ডা. কবির উদ্দীনের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে এলে সরকারি নম্বর বন্ধ রাখার প্রবণতা তার পুরোনো অভ্যাস। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এই নীরবতা কি কেবল কাকতালীয়, নাকি অভিযোগের জবাব এড়ানোর কৌশল?

তদন্ত হবে, নাকি চাপা পড়বে অভিযোগ?

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিভিন্ন স্তরে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—এতসব গুরুতর অভিযোগের পরও কেন নীরব প্রশাসন? কেন এখনো দৃশ্যমান কোনো তদন্ত কমিটি বা জবাবদিহিতার উদ্যোগ নেই?

ভুক্তভোগীদের দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে বেরিয়ে আসতে পারে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কোটি টাকার আর্থিক লেনদেনের চিত্র।

এখন দেখার বিষয়—অভিযোগের ভারে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ডা. কবির উদ্দীনের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, নাকি অভিযোগগুলোও হারিয়ে যায় প্রশাসনিক নীরবতার আড়ালে।

বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে……….

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ