রবিবার, ৮ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

দুর্নীতির রাজপুত্র কর অঞ্চল-৬-এর কর্মচারী লিটন, দুদকে মামলা করার প্রস্তুতি

স্টাফ রিপোর্টার
নভেম্বর ৮, ২০২৬ ৪:২২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ফাইল ছবি

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর অঞ্চল-৬-এর ১২০ নম্বর সার্কেলের নোটিশ সার্ভার লিটন মিয়ার বিরুদ্ধে আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিপুল সম্পদ অর্জন, প্রভাব খাটিয়ে অনিয়ম, ফাইল ট্যাম্পারিং এবং চাকরি দেওয়ার প্রলোভনে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সরকারি চতুর্থ শ্রেণির একজন কর্মচারী হয়েও তাঁর জীবনযাপন, সম্পদ ও কথিত প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

ফাইল ট্যাম্পারিং ও কথিত সিন্ডিকেটের অভিযোগ

অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন কর অফিসে চাকরির সুবাদে বিভিন্ন বড় কোম্পানির সঙ্গে লিটন মিয়া অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। অর্থের বিনিময়ে করসংক্রান্ত ফাইল ট্যাম্পারিং, গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েব করা এবং পছন্দমতো ফাইলের কাজ করিয়ে দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

আরও অভিযোগ, তিনি নিজে কর অঞ্চল-৬-এ কর্মরত থাকলেও অন্যান্য কর অঞ্চলগুলোতেও তাঁর ঘনিষ্ঠ লোকজন রয়েছেন। তাঁদের নিয়ে গড়ে উঠেছে কথিত ‘লিটন সিন্ডিকেট’। এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের মাধ্যমে বিভিন্ন কর অঞ্চলের ফাইলসংক্রান্ত কাজ নিজের ইচ্ছামতো পরিচালনা করার অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও দাপ্তরিকভাবে যাচাই করা তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

অফিস সময়েও কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ

সরকারি কর্মচারী হিসেবে নির্ধারিত অফিস সময় মেনে দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও লিটন মিয়ার বিরুদ্ধে ইচ্ছামতো অফিসে আসা-যাওয়া এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সার্কেলে নিয়মিত উপস্থিত না থাকার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, অফিস সময়ের বড় একটি অংশ তাঁকে নিজ কর্মস্থলের পরিবর্তে অন্য কর অঞ্চলগুলোতে ফাইল হাতে তদবিরের কাজে দেখা যায়। তাঁর দায়িত্ব পালনের সময়সূচি, উপস্থিতির রেকর্ড এবং কর্মস্থলের বাইরে অবস্থানের বিষয়টি যাচাই করা হলে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

‘লিটন-রুবেল নিয়োগ সিন্ডিকেট’, চাকরির প্রলোভনে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ

লিটন মিয়াকে ঘিরে আলোচনায় এসেছে কথিত ‘লিটন-রুবেল নিয়োগ সিন্ডিকেট’। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরি পাওয়ার বিষয়টিকে পুঁজি করে তিনি বিভিন্ন চাকরিপ্রার্থীর কাছে প্রভাব ও যোগাযোগের কথা প্রচার করেন। রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার দাবি করে চাকরিপ্রার্থীদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, নিজের সরকারি চাকরির পরিচয়কে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তিনি চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা অগ্রিম গ্রহণ করেছেন। কিন্তু বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও অনেকে চাকরি পাননি। পরবর্তী সময়ে টাকা ফেরত চাইলে তাঁদের হুমকি ও বিভিন্নভাবে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগও উঠেছে।

এমনকি নিজ জেলা শেরপুরে আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে পরিচয় দেওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির নেতা হিসেবে পরিচয় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে ছবি তুলে তাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার বিষয়টি চাকরিপ্রার্থীদের কাছে প্রচার করতেন বলেও অভিযোগকারীদের দাবি।

সম্প্রতি চাকরি দেওয়ার কথা বলে অর্থ গ্রহণের পর চাকরি কিংবা টাকা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগে লিটন মিয়ার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বলে জানা গেছে। এর আগেও একই ধরনের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকার কথা বলা হচ্ছে। এসব মামলার নথি, অভিযোগের বিবরণ এবং আদালতের সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।

নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে রাজকীয় জীবনযাপনের অভিযোগ

লিটন মিয়ার সম্পদ ও জীবনযাপন নিয়েও শেরপুরে নানা আলোচনা রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, তাঁর নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের নামে জমি, বাড়ি ও ব্যাংক হিসাবসহ বিভিন্ন সম্পদ রয়েছে, যা তাঁর বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

শেরপুরে সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহকালে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, লিটন মিয়া জন্মগ্রহণ করেছেন এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে। কিন্তু তিনি চাকরি পাওয়ার পর থেকে যেন আলাউদ্দিনের চেরাগ পেয়েছেন। গ্রামে আসেন নিজস্ব গাড়িতে, চলাফেরায় রাজকীয় ভাব এসেছে। তিনি একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী, তা আমরা আজ আপনাদের কাছ থেকে শুনলাম। তিনি চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হলে কত টাকা বেতন পান, যে এত সম্পদের মালিক হয়েছেন—এটা প্রশ্নের সৃষ্টি করে। বিষয়টি তদন্ত হওয়া উচিত।

স্থানীয়দের এমন বক্তব্যের পর তাঁর আয়, চাকরির বেতন, সম্পদের উৎস, জমি-জমা, বাড়ি এবং ব্যাংক লেনদেনের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

তদন্তের আওতায় আনার দাবি

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি চাকরির পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন, দাপ্তরিক কাজে প্রভাব বিস্তার কিংবা চাকরির প্রলোভনে অর্থ গ্রহণের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকেন, তাহলে তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জন্য উদ্বেগজনক। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ জরুরি।

জনস্বার্থে লিটন মিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে তাঁর আয়কর নথি, আয়-ব্যয়ের হিসাব, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, ব্যাংক লেনদেন, চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ, দায়ের করা মামলার নথি এবং কর অঞ্চলগুলোতে তাঁর কথিত প্রভাব ও যোগাযোগের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে লিটন মিয়ার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।