নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগের বিভিন্ন উন্নয়ন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি এবং টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ ঘুরপাক খাচ্ছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এএসএম মুসা। স্থানীয় ঠিকাদার, সংশ্লিষ্ট সূত্র ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বিস্ময়কর সব তথ্য, যা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রকৌশলী মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, মার্কেট, দোকান ও স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন (ভ্যালুয়েশন) রিপোর্ট তৈরির নামে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এই ভ্যালুয়েশন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছিল, যার মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সারাক্ষণ বার্তার অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাস থেকে নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগের দায়িত্বে থাকা এএসএম মুসার সময়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রমে অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। অধীনস্থ কয়েকজন কর্মকর্তার মাধ্যমে ভ্যালুয়েশন রিপোর্ট প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগে ইতোমধ্যে একজন কর্মকর্তাকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন।
এদিকে গণপূর্ত বিভাগের একাধিক এলটিএম (LTM) টেন্ডার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় ঠিকাদাররা। তাদের অভিযোগ, স্বাভাবিক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে যেখানে একটি টেন্ডারে ৩০ থেকে ৩৫টি পর্যন্ত সিডিউল বিক্রি হওয়ার কথা, সেখানে একাধিক টেন্ডারে মাত্র ১ থেকে ৩টি সিডিউল দেখিয়ে কাজ বণ্টন করা হয়েছে। এর ফলে প্রকৃত প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের বিভিন্ন টেন্ডার আইডির নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বেশ কয়েকটি টেন্ডারে মাত্র ১, ২ কিংবা ৩টি রেসপন্স দেখিয়ে মূল্যায়ন সম্পন্ন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এসব ঘটনা টেন্ডার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
অন্যদিকে জুলাই আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত সরকারি স্থাপনা মেরামত ও পুনর্নির্মাণ কাজ নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে আগে কাজ করিয়ে পরে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে, যা সরকারি ক্রয়নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় বড় অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে।
স্থানীয় কয়েকজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বর্তমান সময়ে নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগে কাজ পেতে হলে প্রভাব ও বিশেষ যোগাযোগের প্রয়োজন হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত প্রতিযোগিতা অনুপস্থিত বলে মনে হয়।
শুধু নরসিংদী নয়, এর আগেও ভোলা গণপূর্ত বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে এএসএম মুসার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও টেন্ডার ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সে সময়ও কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠে আসে।
এছাড়া বিভাগটির কয়েকজন উপসহকারী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধেও বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা, পার্সেন্টেজ বাণিজ্য এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য নির্বাহী প্রকৌশলী এএসএম মুসার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
এখন প্রশ্ন উঠেছে—নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগের আলোচিত এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হবে কি? কোটি কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অনিয়মের প্রকৃত চিত্র কি কখনও জনসম্মুখে আসবে? সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, স্বচ্ছ তদন্তই পারে এসব প্রশ্নের জবাব দিতে।
বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে………
