গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংস্থাপন শাখাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বদলি বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ। এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ সারোয়ার জাহান। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দায়ের করা লিখিত অভিযোগে উঠে এসেছে বদলি প্রক্রিয়াকে ঘিরে ভয়াবহ অনিয়ম, আর্থিক লেনদেন, সিন্ডিকেট পরিচালনা এবং অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার নানা অভিযোগ।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এত গুরুতর অভিযোগের পরও তদন্তের গতি কেন দৃশ্যমান নয়?
বদলি নাকি বাণিজ্য?
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষভাগে সংস্থাপন শাখার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সারোয়ার জাহানের হাত ধরে বদলি প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক তৎপরতা শুরু হয়। বিভিন্ন অফিস আদেশে তাঁর স্বাক্ষর দেখা যায় ২০২৫ সালের শেষার্ধ থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত। এই সময়ে অসংখ্য প্রকৌশলী ও কর্মকর্তার বদলিতে তিনি প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মার্চ ২০২৬-এ একদিনেই অর্ধশতাধিক প্রকৌশলীর বদলি আদেশ জারি করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, এসব বদলির অনেকগুলোই সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে করা হয়েছে। এমনকি একই কর্মস্থলে দুই বছর পূর্ণ না হওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও বদলি করা হয়েছে, যা প্রচলিত নিয়মের পরিপন্থী।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, লোভনীয় পোস্টিংয়ের বিনিময়ে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে। কারও জন্য সুবিধাজনক পদায়ন, আবার কারও জন্য হয়রানিমূলক বদলি—সবকিছুর পেছনেই ছিল একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ, স্থগিত অর্ধশতাধিক বদলি
অভিযোগ এতটাই গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছায় যে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় নিজেই বিষয়টি আমলে নেয়। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মার্চ-এপ্রিল ২০২৬-এ জারিকৃত অর্ধশতাধিক বদলি আদেশ নিয়মবহির্ভূত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সেগুলোর অনেকগুলো স্থগিত করা হয়েছে।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের নির্দেশে বড় আকারের বদলি কিংবা পদোন্নতির ফাইল মন্ত্রণালয়কে অবহিত না করে অগ্রসর না করার কড়া নির্দেশ জারি করা হয়েছে। প্রশাসনিক মহলে এটিকে অনিয়মের বিরুদ্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পুরোনো কেলেঙ্কারির ছায়া
সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ শুধু বদলি বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, জামানতের টাকা অবৈধভাবে ক্যাশ করার অভিযোগ আগেই তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তে প্রমাণিত হয়েছিল। এ ঘটনায় ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট গণপূর্ত অধিদপ্তর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললেও রহস্যজনকভাবে পরবর্তীতে তাঁকে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—যেখানে তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল, সেখানে কীভাবে কোনো শাস্তি ছাড়াই অব্যাহতি দেওয়া হলো? এই অব্যাহতি প্রক্রিয়াতেও অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মোহাম্মদপুরের বাড়ি, বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে আরও বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় সারোয়ার জাহান কিংবা তাঁর পরিবারের নামে একটি বাড়ি রয়েছে, যার মূল্য ও সম্পদের উৎস তাঁর বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
শুধু তাই নয়, বিদেশে অর্থ পাচার এবং অবৈধ সম্পদ সৃষ্টির অভিযোগও করা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের টেন্ডার সিন্ডিকেট ও কথিত ‘মাফিয়া চক্রের’ সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন।
বর্তমানে দুদক গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকৌশলীর অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান করছে এবং সারোয়ার জাহানের বিষয়টিও তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে।
কেন বারবার বিতর্কের কেন্দ্রে গণপূর্ত?
গণপূর্ত অধিদপ্তরে বদলি-পদায়ন, টেন্ডার প্রক্রিয়া, জামানতের অর্থ আত্মসাৎ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে এসব অভিযোগ উঠে এলেও অনেক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান শাস্তির নজির খুব কম।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারদের একটি অংশের অভিযোগ, শাস্তির অভাবই দুর্নীতিবাজদের আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।
বিশেষ করে জামানত কেলেঙ্কারির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও সারোয়ার জাহানের মতো একজন কর্মকর্তাকে সংস্থাপন শাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসানো নিয়ে প্রশাসনিক মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি-
প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার ইকবালুর রহিম দুদকে দায়ের করা অভিযোগে বলেছেন, এসব অনিয়ম সরকারি প্রশাসনের স্বচ্ছতা, জনস্বার্থ এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।
তিনি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়ে সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত সব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, অবৈধ সম্পদ জব্দ এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
সারোয়ার জাহানের বক্তব্য- তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সারোয়ার জাহান। তিনি বলেন, বদলির আদেশ আমি একা করি না। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন), নির্বাহী প্রকৌশলীসহ আমরা যৌথভাবে মিটিং করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা।
তাঁর দাবি, গণপূর্ত অধিদপ্তরে এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয় এবং অতীতেও বিভিন্ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে।
তদন্তের অপেক্ষায় প্রশাসন
দুদকের অনুসন্ধান এবং মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনা এখন এই আলোচিত ঘটনার মূল কেন্দ্রবিন্দু। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, অভিযোগগুলো যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তবে এটি শুধু একজন কর্মকর্তার অনিয়ম নয়; বরং গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রশাসনিক ব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত দুর্নীতির একটি বড় চিত্র উন্মোচিত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি ধামাচাপা না দিয়ে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও সময়োপযোগী তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন করা জরুরি। অন্যথায় জনমনে প্রশ্ন থেকেই যাবে—দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও কেন বারবার পার পেয়ে যান প্রভাবশালী কর্মকর্তারা?
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান প্রায়ই বলে থাকেন, “দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে শুধু বদলি, অব্যাহতি বা চাকরিচ্যুতি যথেষ্ট নয়; আইনি বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় দুর্নীতি আরও উৎসাহিত হয়।
এখন দেখার বিষয়, দুদকের তদন্ত শেষ পর্যন্ত সত্যিই কতদূর এগোয়, আর গণপূর্তের এই বহুল আলোচিত অভিযোগের শেষ পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।
