গণপূর্ত অধিদপ্তরের শেরেবাংলা নগর–১ উপবিভাগকে ঘিরে ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে বিতর্কের কালো মেঘ। সেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মতিউর রহমান এখনও নীরব। আর তার এই রহস্যময় নীরবতাই এখন জন্ম দিচ্ছে নতুন নতুন প্রশ্ন, নতুন সংশয়, নতুন আলোচনার।
অভিযোগের পর অভিযোগ, তথ্যের পর তথ্য সামনে এলেও নেই কোনো ব্যাখ্যা, নেই আত্মপক্ষ সমর্থনের ন্যূনতম চেষ্টাও। যেন নীরবতার আড়ালেই লুকিয়ে আছে অদৃশ্য কোনো শক্তির ছায়া। গত ২৪ এপ্রিল সমতল মাতৃভূমি’র অনুসন্ধানী ফলোআপের দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশের পরও বহাল তবিয়তে রয়েছেন মতিউর রহমান। দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ না থাকায় সমালোচনার তীর এখন ছুঁয়ে যাচ্ছে প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামানের দিকেও।
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন—
অভিযোগ এত গুরুতর হওয়ার পরও কেন নেই জিজ্ঞাসাবাদ?
কেন থেমে আছে তদন্তের গতি?
তবে কি পুরো ব্যবস্থার ভেতরেই গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য সুরক্ষা বলয়?
অভিযোগ রয়েছে, OTM টেন্ডার পদ্ধতির আড়ালে দীর্ঘদিন ধরেই তৈরি হয়েছিল এক গোপন সাম্রাজ্য। যেখানে দরপত্র ছিল কেবল আনুষ্ঠানিকতা, আর কাজের ভাগাভাগি হতো নেপথ্যের সমঝোতায়। সেই অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার নীরব পরিচালক হিসেবে ঘুরেফিরে উঠে আসছে মতিউর রহমানের নাম।
স্থানীয় ঠিকাদারদের অনেকেই বলছেন, তার সঙ্গে সম্পর্ক মানেই কাজের নিশ্চয়তা—আর দূরত্ব মানেই অনিশ্চয়তা। এই বাস্তবতা যেন এক অদ্ভুত ক্ষমতার সম্পর্ক, যেখানে ভয়, নির্ভরতা আর স্বার্থ মিলেমিশে তৈরি করেছে এক নীরব আধিপত্য।
সবচেয়ে বেশি আলোচিত এখন তার নীরবতা। সাধারণত অভিযোগ উঠলে দেখা যায় ব্যাখ্যা, প্রতিবাদ কিংবা অন্তত একটি প্রতিক্রিয়া। কিন্তু এখানে নেই কিছুই। না কোনো বক্তব্য, না কোনো অস্বীকৃতি। ফলে প্রশ্ন আরও গভীর হচ্ছে—
এই নীরবতা কি আত্মরক্ষার কৌশল?
নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও বড় কোনো প্রভাবশালী ছায়া?
অভিযোগ আছে, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা এবং প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্কের কারণেই দীর্ঘদিন ধরে তিনি পেয়েছেন এক ধরনের অদৃশ্য নিরাপত্তা বলয়। ফলে অভিযোগ উঠলেও তা অনেক সময় ফাইলের পাতাতেই সীমাবদ্ধ থেকেছে, পৌঁছায়নি কার্যকর তদন্ত বা বিচারের পর্যায়ে।
এদিকে সম্পদের অসামঞ্জস্য নিয়েও বাড়ছে আলোচনা। সরকারি চাকরির সীমিত আয়ের বিপরীতে বিলাসবহুল জীবনযাপন, জমি, ফ্ল্যাট ও বিভিন্ন বিনিয়োগ—সব মিলিয়ে তার সম্পদের উৎস নিয়েও উঠছে গুরুতর প্রশ্ন। যেন তার নীরবতার মতোই সম্পদের গল্পও ঢাকা রহস্যের পর্দায়।
গণপূর্তের ভেতরে-বাইরে এখন একটাই গুঞ্জন—
মতিউর রহমান কেন চুপ?
কারও মতে, এটি সময়ক্ষেপণের কৌশল।
কারও মতে, চাপের ইঙ্গিত।
আবার কেউ বলছেন, এই নীরবতা আসন্ন ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা।
তবে বাস্তবতা হলো—যত সময় যাচ্ছে, ততই ঘনীভূত হচ্ছে সন্দেহের মেঘ। প্রশ্ন উঠছে পুরো ব্যবস্থার জবাবদিহি নিয়েও। কারণ বিষয়টি এখন আর শুধু একজন প্রকৌশলীকে ঘিরে নয়—এটি রাষ্ট্রীয় অর্থের নিরাপত্তা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং জনগণের আস্থার প্রশ্ন।
সংশ্লিষ্টদের দাবি স্পষ্ট—
স্বচ্ছ তদন্ত চাই, নিরপেক্ষ জবাবদিহি চাই, এবং অভিযোগের সত্যতা উদঘাটনে কার্যকর পদক্ষেপ চাই।
অন্যদিকে এসব অভিযোগের বিষয়ে মতিউর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। খুদে বার্তা পাঠানো হলেও মেলেনি কোনো জবাব। তার এই দীর্ঘ নীরবতা এখন আরও বেশি করে উসকে দিচ্ছে নানা গুঞ্জন, নানা রহস্য, নানা অস্বস্তিকর প্রশ্ন।
শেষ পর্যন্ত নজর এখন এক জায়গাতেই—
এই নীরবতা কি ভাঙবে?
নাকি প্রভাবের ভারে আবারও চাপা পড়ে যাবে সত্য?
সময়ের অপেক্ষায় এখন পুরো মহল।
