প্রতীকী ছবি
রাজধানীর মুগদার মান্ডা এলাকার ভয়াবহ সেই ৮ টুকরা লাশের রহস্য উন্মোচনের দাবি করেছে র্যাব। সৌদি আরব প্রবাসী মোকাররম মিয়াকে হত্যার পর মরদেহ খণ্ড-বিখণ্ড করে ফেলে দেওয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন হেলেনা বেগম ও তার কিশোরী মেয়ে। রোববার রাত পৌনে ১২টার দিকে মান্ডা এলাকা থেকে তাদের আটক করে র্যাব–৩। এ ঘটনায় জড়িত তাসলিমা আক্তার ওরফে হাসনাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
র্যাব জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্তরা যেন কিছুই ঘটেনি— এমন স্বাভাবিক আচরণ করতে বাইরে ঘুরতে যায়, হোটেলে বিরিয়ানি খায়, এমনকি রাতে ছাদে পার্টির আয়োজনও করে। প্রতিবেশীদেরও সেই পার্টিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়।
সোমবার বিকেলে রাজধানীর শাহজাহানপুরে র্যাব–৩ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ব্যাটালিয়নের উপ–অধিনায়ক সাইদুর রহমান জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোকাররম মিয়ার সঙ্গে একই গ্রামের আরেক সৌদি প্রবাসী সুমনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সেই সূত্রে সুমনের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার ওরফে হাসনার সঙ্গে পরিচয় হয় মোকাররমের। একপর্যায়ে পরিচয় গড়ায় প্রেমে। দূর প্রবাস থেকেও নিয়মিত অডিও–ভিডিও কলে চলত তাদের কথোপকথন। ভালোবাসার টানে মোকাররম বিভিন্ন সময়ে তাসলিমাকে পাঁচ লাখ টাকারও বেশি অর্থ দেন।
গত ১৩ মে সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরেন মোকাররম। পরিবারের কাউকে কিছু না জানিয়ে ছুটে যান তাসলিমার কাছে। মান্ডা এলাকার একটি ভাড়া বাসায় তাদের দেখা হয়— যে বাসায় থাকতেন তাসলিমার বান্ধবী হেলেনা ও তার দুই মেয়ে। সেই ঘরেই একসঙ্গে সময় কাটাচ্ছিলেন মোকাররম, তাসলিমা ও হেলেনারা।
র্যাবের ভাষ্য, রাত গভীর হলে সম্পর্কের মোড় নেয় ভয়ংকর দিকে। বিয়ে নিয়ে শুরু হয় তর্ক। তাসলিমা বিয়েতে রাজি না হলে মোকাররম নিজের দেওয়া টাকা ফেরত চান। পাশাপাশি মোবাইলে থাকা ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেন। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, যখন মোকাররমের বিরুদ্ধে হেলেনার কিশোরী মেয়ের সঙ্গে অসামাজিক আচরণের চেষ্টার অভিযোগ ওঠে।
এরপরই তৈরি হয় হত্যার পরিকল্পনা।
পরদিন সকালে নাস্তার সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে মোকাররমকে খাওয়ানো হয়। ঝিমিয়ে পড়লে বালিশচাপা দিয়ে হত্যার চেষ্টা করেন হেলেনা। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাসলিমা হাতুড়ি নিয়ে এগিয়ে আসেন। পরে হেলেনা বটি দিয়ে মোকাররমের গলায় কোপ দেন। তাসলিমাও পরপর কয়েকটি কোপ দেন বলে জানিয়েছে র্যাব। জিজ্ঞাসাবাদে উঠে এসেছে, কিশোরী মেয়েটিও হাতুড়ি দিয়ে মাথায় আঘাত করে।
মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর শুরু হয় আরও বিভীষিকাময় অধ্যায়। বাথরুমে নিয়ে রক্ত পরিষ্কার করা হয়। এরপর মরদেহ আট টুকরা করে পলিথিন ও বস্তায় ভরে রাখা হয়। প্রায় ১২ ঘণ্টা পর বৃহস্পতিবার গভীর রাতে সাত টুকরা মরদেহ ভবনের নিচে ময়লার স্তূপে ফেলে দেওয়া হয়। মাথার অংশটি প্রায় এক কিলোমিটার দূরে নিয়ে গিয়ে ফেলে আসে তারা।
শনিবার দুপুরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়রা ৯৯৯–এ ফোন দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহের খণ্ডাংশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে এনআইডি শনাক্ত করে নিহতের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। গ্রেপ্তার হেলেনার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরে মোকাররমের মাথার অংশও উদ্ধার করা হয়েছে।
র্যাব জানিয়েছে, এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডে জড়িত পলাতক তাসলিমাকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
