মঙ্গলবার, ১৯শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সীমান্তজুড়ে ‘ম্যানেজ সিন্ডিকেট’ আতঙ্ক! মাদক-চোরাচালানের গোপন করিডোরে অশনি সংকেত

মামুনুর রশীদ মামুন
মে ১৮, ২০২৬ ৭:০৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ময়মনসিংহ বিভাগের সীমান্তঘেঁষা কয়েকটি উপজেলা—হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, নকলা, দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা—নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভারতের সীমান্তঘেঁষা দুর্গম এসব অঞ্চলকে ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে মাদক, চোরাইপণ্য ও অবৈধ সামগ্রীর বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। আর এই পুরো চক্র টিকিয়ে রাখতে সক্রিয় রয়েছে কথিত “ম্যানেজ সংস্কৃতি” যেখানে প্রভাবশালী দালালচক্র ও অসাধু সদস্যদের যোগসাজশে সীমান্তপথ যেন অদৃশ্য ছত্রচ্ছায়ায় সচল রাখা হচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্তের অন্ধকার রাত এখন অনেকটাই ‘নীরব বাণিজ্যের’ নিয়ন্ত্রিত করিডোরে পরিণত হয়েছে। পাহাড়ি ও দুর্গম পথ ব্যবহার করে গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত সন্দেহজনক চলাচল বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে। অভিযোগ রয়েছে, শুধু ইয়াবা বা গাঁজাই নয়—ভারতীয় কসমেটিকস, নিষিদ্ধ ট্যাবলেট, ইলেকট্রনিক পণ্য, এমনকি গবাদিপশুও অবৈধভাবে প্রবেশ করছে দেশের ভেতরে।

সরেজমিনে স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সচেতন মহলের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে ভয়ংকর এক বাস্তবতা। মাঝে মাঝে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাটকীয় অভিযান, মাদক জব্দ ও কয়েকজন বাহক গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশ পেলেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে সীমান্তপথে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও মাদক পাচার থামছে না, বরং নতুন কৌশলে আরও বিস্তৃত হচ্ছে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।

‘ম্যানেজ সংস্কৃতি’ ঘিরে বিস্ফোরক অভিযোগ

স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, সীমান্তকেন্দ্রিক এই অবৈধ বাণিজ্যের পেছনে রয়েছে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট। তাদের দাবি, নিয়মিত আর্থিক সুবিধা ও প্রভাব খাটিয়ে সীমান্তপথ সচল রাখা হয়। যদিও এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এখনো প্রকাশ্যে আসেনি, তবুও এলাকাজুড়ে বিষয়টি এখন প্রকাশ্য আলোচনার কেন্দ্রে।

সাবেক জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বলছেন, বছরের পর বছর ধরে সীমান্ত এলাকায় এমন এক “ম্যানেজ সংস্কৃতি” তৈরি হয়েছে, যার কারণে অভিযান হলেও তা স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারছে না। তাদের মতে, শুধুমাত্র ছোট বাহক গ্রেপ্তার নয়—মূল নিয়ন্ত্রকদের চিহ্নিত করে সমন্বিত অভিযান চালানো জরুরি।

তরুণ সমাজে মাদকের কালো ছায়া

সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে তরুণ সমাজের ওপর। শিক্ষক, অভিভাবক ও সমাজকর্মীদের অভিযোগ—সহজলভ্য মাদকের কারণে স্কুল-কলেজপড়ুয়া কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেও নেশার বিস্তার বাড়ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে কিশোর গ্যাং, ছিনতাই, সামাজিক সহিংসতা ও পারিবারিক অস্থিরতা।

দুর্গাপুরের এক শিক্ষক বলেন, আগে গ্রামে মাদক নিয়ে এত ভয় ছিল না। এখন প্রায় প্রতিটি এলাকায় কোনো না কোনোভাবে এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। পরিবারগুলো আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।

অভিযান হচ্ছে, তবু থামছে না কারবার
সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত এলাকায় বিভিন্ন বাহিনীর একাধিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে মাদক ও চোরাইপণ্য, গ্রেপ্তারও হয়েছে কয়েকজন। কিন্তু স্থানীয়দের প্রশ্ন—একই রুট দিয়ে বারবার কীভাবে বড় চালান প্রবেশ করছে?

তাদের অভিযোগ, অনেক সময় বড় চালানের আগাম তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। ফলে মাঠের ছোট সদস্যরা ধরা পড়লেও মূল কারবারিরা নিরাপদেই থেকে যায়। স্থানীয়দের মতে, সীমান্তে শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়—প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, শক্তিশালী গোয়েন্দা তৎপরতা ও আন্তঃসংস্থার সমন্বিত অভিযান প্রয়োজন।

জাতীয় নিরাপত্তা নিয়েও বাড়ছে শঙ্কা

বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তপথে মাদক ও চোরাচালান এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। কারণ, মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে অস্ত্র, অর্থপাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের সম্পর্ক গড়ে ওঠার ঝুঁকি বাড়ছে দিন দিন।

স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, এখনই কঠোর ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা না নিলে সীমান্তপথের এই অবৈধ নেটওয়ার্ক ভবিষ্যতে ভয়াবহ সামাজিক সংকটে রূপ নিতে পারে। তাদের দাবি, সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোকে বিশেষ নজরদারির আওতায় এনে কেন্দ্রীয়ভাবে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ও মনিটরিং চালু করা জরুরি।

উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ চান স্থানীয়রা

স্থানীয়দের মতে, টেকসই সমাধানের জন্য শুধু প্রশাসনিক অভিযান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স এবং কঠোর জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা। পাশাপাশি সীমান্তবাসীর বিকল্প কর্মসংস্থান ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগও নিতে হবে।

তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সীমান্তের এই গোপন অবৈধ নেটওয়ার্ক আরও বিস্তৃত হয়ে দেশের অভ্যন্তরে বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।