সিএনজি প্রতিস্থাপন, নিবন্ধন ও রুট পারমিটে ঘুষ বাণিজ্যের দাবি; ভারতে অর্থ পাচার ও সম্পদ গড়ার অভিযোগ। ফাইল ছবি
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) ঢাকা মেট্রো সার্কেল-৩ (দিয়াবাড়ী, উত্তরা)-এ কর্মরত উপপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) প্রকৌশলী সুব্রত দেবনাথের বিরুদ্ধে চাকরিজীবনের শুরু থেকে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনকালে শত কোটি টাকার অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও বিদেশে অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা/মন্ত্রী বরাবর এ লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। ‘ঢাকা মহানগর অটোরিকশা চালক শ্রমিক ইউনিয়ন’ (রেজি. নং ঢাক-২২৪০)-এর সাধারণ সম্পাদক মো. মোশারফ হোসেন স্বাক্ষরিত স্মারকে সুব্রত দেবনাথের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, ২০১১ সালে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সুব্রত দেবনাথ বিআরটিএতে সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) হিসেবে যোগদান করেন। এরপর বিভিন্ন সার্কেল ও সদর দপ্তরে পদায়নকালে তিনি সিএনজি অটোরিকশার প্রতিস্থাপন, নতুন নিবন্ধন, ফিটনেস সনদ প্রদান, মালিকানা পরিবর্তন এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে একটি সুসংগঠিত বাণিজ্য চক্র গড়ে তোলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
২ হাজার ৫০০ সিএনজি প্রতিস্থাপনে ৭৫ কোটি টাকা ঘুষের অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম মেট্রো বিআরটিএতে সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মাত্র চার মাসের মধ্যে ২০০৩ ও ২০০৪ মডেলের প্রায় ২ হাজার ৫০০টি সিএনজি অটোরিকশা স্ক্র্যাপ ও প্রতিস্থাপনের নামে শোরুম মালিকদের একটি সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগসাজশ করেন সুব্রত দেবনাথ।
অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, এ প্রক্রিয়ায় প্রতিটি গাড়ির বিপরীতে ৩ লাখ টাকা হারে মোট প্রায় ৭৫ কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য করা হয়।
এরপর চট্টগ্রাম থেকে বদলি হয়ে ঢাকা মেট্রো সার্কেল-২-তে যোগদানের পর প্রায় ২ হাজার সিএনজি অটোরিকশার প্রতিস্থাপন নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় প্রতি গাড়িতে ৫০ হাজার টাকা হারে মোট প্রায় ১০ কোটি টাকা উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগ আনা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
একই সময়ে ঢাকা জেলা সার্কেলের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকাকালে নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রায় ৫০০টি সিএনজির নিবন্ধন দিয়ে আরও প্রায় ৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
৪০০ স্লিপার বাসের রুট পারমিটে ২০ কোটি টাকার অভিযোগ
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০২২ সালে উপপরিচালক পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর বিআরটিএ প্রধান কার্যালয়ে উপপরিচালক (ইঞ্জি.)-৩ হিসেবে আন্তঃজেলা রুট পারমিট-সংক্রান্ত দায়িত্ব পান সুব্রত দেবনাথ।
এ দায়িত্বে থাকাকালে তিনি নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রায় ৪০০টি স্লিপার বাসের রুট পারমিট প্রদান করেন বলে অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে। প্রতিটি গাড়ির বিপরীতে ৫ লাখ টাকা হারে তাঁর নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট প্রায় ২০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
বদলির পরও থামেনি অভিযোগ, ফের ঢাকায় পদায়ন
অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে সমালোচনার মুখে সুব্রত দেবনাথকে ময়মনসিংহ বিভাগীয় কার্যালয়ে বদলি করা হয়। তবে চলতি বছরের জুন মাসে তিনি পুনরায় ঢাকা মেট্রো সার্কেল-৩ (উত্তরা)-এ উপপরিচালক পদে যোগ দেন।
অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, বর্তমান কর্মস্থলেও তিনি তাঁর প্রভাব বলয় অক্ষুণ্ন রেখে অবৈধ অর্থ লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
ভারতে অর্থ পাচার ও সম্পদের অভিযোগ
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হিসেবে উঠে এসেছে বিদেশে অর্থ পাচারের বিষয়টি। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত বিপুল অর্থ অবৈধ উপায়ে ভারতে পাচার করেছেন সুব্রত দেবনাথ। সেখানে তাঁর নামে ও বেনামে একাধিক বাড়ি, গাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া দেশের অভ্যন্তরে রাজধানীর পশ্চিম রামপুরা এলাকাতেও তাঁর নামে একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট থাকার তথ্য দেওয়া হয়েছে অভিযোগে।
অতীতের নথি যাচাই করে তদন্তের দাবি
ঢাকা মহানগর অটোরিকশা চালক শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে দেওয়া অভিযোগপত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সুব্রত দেবনাথের অতীত কর্মকাণ্ডের সব নথি ও ফাইলপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনার আহ্বান জানানো হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানানো হয়েছে।
সংগঠনটির অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিআরটিএর বিভিন্ন সার্কেলে দায়িত্ব পালনকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে সুব্রত দেবনাথ একটি সুসংগঠিত দুর্নীতির নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন, যার শিকার হয়েছেন সাধারণ পরিবহন মালিক ও চালকেরা। বিশেষ করে সিএনজি অটোরিকশা ও বাস মালিকদের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ আদায়ের অভিযোগ সংগঠনটির সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানা গেছে।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি অভিযুক্তের
এ বিষয়ে অভিযুক্ত প্রকৌশলী সুব্রত দেবনাথের প্রতিক্রিয়া জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া দুদক বা সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও অভিযোগটি নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
তবে দুদকের জনসংযোগ বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, দীর্ঘদিন দুদকে কমিশন না থাকায় কার্যক্রমে কিছুটা ধীরগতি ছিল। দুদকের বর্তমান চেয়ারম্যান এ কে এম আসাদুজ্জামান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সারা দেশে আবারও দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালনা শুরু হয়েছে।
জনসংযোগ বিভাগ থেকে আরও জানানো হয়েছে, বিআরটিএ নিয়ে ‘ভুরি ভুরি’ অভিযোগ রয়েছে এবং চেয়ারম্যানের অনুমতি সাপেক্ষে শিগগিরই বিআরটিএতে অভিযান পরিচালনা শুরু করা হবে।
রাষ্ট্রীয় সেবা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের সংগঠিত দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ জনসাধারণের আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে পরিবহন খাতে সাধারণ মালিক ও চালকদের কাছ থেকে অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগ প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন তাঁরা।
আপাতত অভিযোগকারী সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট মহল দুদকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দ্রুত তদন্ত শুরুর প্রত্যাশায় রয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নেয়, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।
