পাবনার ঈশ্বরদীর মানিকনগর গ্রামে আমিরুল সরদারের লিচু বাগান। সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমের তোলা ছবি
পাবনার ঈশ্বরদীর গ্রামগুলো যেন এখন লাল রঙের এক উৎসবের নগরী। চারদিকে চোখ মেললেই দেখা যায় গাছে গাছে ঝুলে থাকা টকটকে লাল লিচুর থোকা। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় ব্যস্ততা—কোথাও গাছ থেকে লিচু পাড়া হচ্ছে, কোথাও চলছে বাছাই, আবার কোথাও ঝুড়িভর্তি লিচু ছুটছে হাটের পথে। সেই লিচুই পরে ট্রাকে চড়ে পৌঁছে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের নানা প্রান্তে।
গত দেড় দশকের মধ্যে এবার ঈশ্বরদীতে লিচুর সবচেয়ে ভালো ফলন হয়েছে। ফলে বাগান মালিক, কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী—সবাই যেন নতুন আশার আলো দেখছেন। কৃষি বিভাগের হিসাব বলছে, এ বছর উপজেলায় প্রায় ৭০০ কোটি টাকার লিচু উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
লিচুর মৌসুমে ব্যস্ত নারী শ্রমিকরা
লিচুর ভরা মৌসুম শুধু কৃষকদেরই নয়, হাজারো শ্রমজীবী মানুষের জন্যও নিয়ে আসে বাড়তি আয়ের সুযোগ।
গত মঙ্গলবার সাহাপুর গ্রামের একটি বাগানে দেখা যায়, কয়েকজন নারী শ্রমিক মনোযোগ দিয়ে লিচু বাছাই করছেন। তাদের একজন জাহেদা বেগম। তিনি জানান, সংসারের কাজের ফাঁকে লিচু বাছাইয়ের কাজ করে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় করেন। এই আয় সংসারে বাড়তি স্বস্তি এনে দেয়।
নওদাপাড়া গ্রামেও একই চিত্র। সেখানে কয়েকজন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নারী লিচু বাছাইয়ের কাজে ব্যস্ত। তাদের একজন সুমিত্রা বলেন, কৃষিকাজের পাশাপাশি প্রতিবছর লিচুর মৌসুমে প্রায় এক মাস এই কাজ করেন তারা। এতে যেমন আয় বাড়ে, তেমনি কাজটিও উপভোগ করেন।
গ্রামজুড়ে শত শত বাগান, কোটি টাকার বেচাকেনা
সলিমপুর, সাহাপুর, পাকশী, দাশুড়িয়া, মুলাডুলি ও লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকায় বিস্তৃত রয়েছে শত শত লিচু বাগান। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাগান রয়েছে সলিমপুর ও সাহাপুর ইউনিয়নে।
রাজধানী ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, চাঁদপুর, পটুয়াখালী, খুলনা, বাগেরহাট, যশোর, কুষ্টিয়াসহ দেশের প্রায় সব অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা ঈশ্বরদীতে ছুটে আসেন লিচু কিনতে।
আওতাপাড়া, দাশুড়িয়া ও শিমুলতলাসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন বসে জমজমাট লিচুর হাট। শুধু শিমুলতলা লিচু হাটেই প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার লিচু বিক্রি হয়। অন্যদিকে আওতাপাড়া হাটে ভোর ৪টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত চলে কেনাবেচা, যেখানে প্রতিদিন লেনদেন হয় প্রায় ৫ থেকে ৬ কোটি টাকার।
ভোরের হাটে লাল লিচুর ঢল
ফজরের নামাজ শেষ হতেই লাখ লাখ টসটসে লাল লিচুতে ভরে ওঠে ঈশ্বরদীর হাটগুলো। একসময় গরুর গাড়ি আর ঘোড়ার গাড়িতে করে বাজারে আসত লিচু। সময় বদলেছে। এখন ভ্যান, ইজিবাইক, অটোরিকশা ও বিভিন্ন যানবাহনে করে লিচু পৌঁছে যায় হাটে।
সেখানে দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা কৃষকদের কাছ থেকে লিচু কিনে ট্রাকে করে পাঠিয়ে দেন বিভিন্ন জেলা ও শহরে।
১১ হাজার বাগান, ৩ লাখ ৭২ হাজার ফলনশীল গাছ
উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ঈশ্বরদীতে লিচু চাষের সঙ্গে জড়িত কৃষকের সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার। এখানে রয়েছে ১১ হাজার লিচু বাগান এবং ফলনশীল গাছের সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৭২ হাজার।
প্রতিবছর প্রায় ২৮ হাজার টন লিচু উৎপাদিত হয়। সাধারণত ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার লিচু উৎপাদন হলেও এ বছর রেকর্ড ফলনের কারণে সেই অঙ্ক ৭০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
এক কৃষকের স্বপ্ন থেকে শুরু হয়েছিল বিপ্লব
আজ যে ঈশ্বরদী দেশের অন্যতম লিচুর রাজধানী হিসেবে পরিচিত, তার পেছনে রয়েছে একজন মানুষের সাহসী উদ্যোগ।
জাতীয় স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত কৃষক আব্দুল জলিল কিতাব মণ্ডল জানান, ১৯৮২-৮৩ সালের দিকে তিনি প্রথম এক বিঘা জমিতে ১৬টি লিচু গাছ লাগান। তখন অনেকেই এটিকে পাগলামি বলেছিলেন। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সেই বাগানের সাফল্য বদলে দেয় পুরো এলাকার কৃষিচিত্র।
বর্তমানে তাঁর ৬০ বিঘা জমিতে রয়েছে সহস্রাধিক লিচু গাছ। প্রতিবছর শুধু লিচু বিক্রি করেই তিনি আয় করেন ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা।
বদলে গেছে গ্রামের অর্থনীতি-
মানিকনগর গ্রামের কৃষক আমিরুল ইসলাম সরদারের ভাষায়, “শুধু লিচু চাষ করেই গ্রামের শত শত কৃষক এখন স্বাবলম্বী। এলাকায় এখন গরিব মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন।”
ব্যবসায়ীরাও খুশি। শিমুলতলা হাটের ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, গত ১৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে এবার সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয়েছে। সরবরাহ বেশি থাকায় দামও তুলনামূলক কম। ফলে কৃষক ও ব্যবসায়ী—দুই পক্ষই সন্তুষ্ট।
আওতাপাড়া হাটের ব্যবসায়ী জামিরুল ইসলামও জানান, এবার লিচুর ব্যবসা আগের বছরের তুলনায় অনেক ভালো হয়েছে এবং লাভও বেশি হচ্ছে।
লিচুকে ঘিরে বিশাল কর্মযজ্ঞ-
ঈশ্বরদীতে লিচু শুধু একটি ফল নয়, এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক চক্রের কেন্দ্রবিন্দু।
লিচু বাগানে নারী-পুরুষ শ্রমিক রয়েছেন প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার। বাঁশের খাঁচি, টোপর, ডালি তৈরি, কার্টন ও চট সেলাইয়ের কাজে যুক্ত আরও ২০ থেকে ৩০ হাজার মানুষ। পরিবহন ও বিপণনে কাজ করছেন ১০ থেকে ১৫ হাজার মানুষ।
শুধু লিচু বাছাইয়ের কাজেই মৌসুমজুড়ে যুক্ত হন প্রায় ২০ হাজার নারী শ্রমিক।
১৫ বছরের রেকর্ড ভেঙেছে এবারের ফলন
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল মমিন বলেন, বালু ও দোআঁশ মাটির মিশ্রণ থাকায় ঈশ্বরদীর মাটি লিচু চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এ বছর অনুকূল আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
তিনি জানান, গত ১৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে বেশি লিচু উৎপাদন হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে পোকার আক্রমণ ও ফল ঝরে পড়ার হার ছিল খুবই কম। ফলে লিচুর আকার বড় হয়েছে, স্বাদও ভালো হয়েছে। শেষদিকে কিছু গাছ গরমে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সামগ্রিকভাবে উৎপাদন ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
ঈশ্বরদীর লাল লিচু এখন শুধু একটি মৌসুমি ফল নয়; এটি হাজারো কৃষক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীর স্বপ্ন, কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ অর্থনীতির এক উজ্জ্বল প্রতীক।
