ছবি সংগৃহীত
দীর্ঘদিনের আলোচিত সেই কুমির আর নেই বাগেরহাটের হজরত খান জাহান আলী (রহ.) মাজারসংলগ্ন ঐতিহাসিক দিঘিতে। জননিরাপত্তার স্বার্থে দিঘিতে থাকা একমাত্র কুমিরটিকে বুধবার বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে উদ্ধার করে খুলনার বন বিভাগের বন্য প্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসনকেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছে।
বুধবার সকাল থেকেই বন বিভাগ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা কুমিরটি ধরার কার্যক্রম শুরু করেন। কয়েক ঘণ্টার চেষ্টার পর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দিঘির পূর্বপাড়ে কুমিরটির অবস্থান শনাক্ত করা হয়। এরপর সতর্কতা ও বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে দুপুর ১২টার দিকে কুমিরটিকে নিয়ন্ত্রণে এনে দিঘি থেকে তোলা হয়। পরে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থায় গাড়িযোগে কুমিরটিকে খুলনার বন্য প্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসনকেন্দ্রে পাঠানো হয়।
শিশুমৃত্যুর ঘটনার পরই সিদ্ধান্ত-
গত সোমবার রাতে কুমিরটির আক্রমণে ফাতেমা নামের এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। নিহত ফাতেমা আক্তার মাজারে অবস্থানরত এক মানসিক প্রতিবন্ধী নারীর মেয়ে। এ ঘটনায় এলাকাজুড়ে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে জননিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মঙ্গলবার রাতে জরুরি সভা করে জেলা প্রশাসন। সভায় কুমিরটিকে দিঘি থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোসা. আতিয়া খাতুন বলেন, “জননিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মাজারের দিঘি থেকে কুমিরটি অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আপাতত প্রাণীটিকে খুলনার বন্য প্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসনকেন্দ্রে রাখা হবে। পরবর্তী সময়ে কুমিরটির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
আগেও ঘটিয়েছিল আলোড়ন-
এটাই প্রথম নয়। চলতি বছরের ৮ এপ্রিল দিঘির ঘাট থেকে একটি কুকুরকে টেনে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায়ও আলোচনায় আসে কুমিরটি। সেই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
যদিও মাজারের দিঘিতে কুমির থাকার ইতিহাস বহু পুরোনো, বর্তমানে থাকা কুমিরটি খান জাহান আলী (রহ.)-এর অবমুক্ত করা মূল কুমিরের বংশধর ছিল না। ইতিহাসের পাতায় কালাপাহাড়-ধলাপাহাড়
লোককথা ও ইতিহাসে জানা যায়, হজরত খান জাহান আলী (রহ.) দিঘি খননের পর সেখানে এক জোড়া কুমির অবমুক্ত করেছিলেন। পুরুষ কুমিরটির নাম রাখা হয় ‘কালাপাহাড়’ এবং স্ত্রী কুমিরটির নাম ‘ধলাপাহাড়’।
পরবর্তীকালে তাদের বংশধরদের মধ্যেও একই নামের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হতো। বহু বছর ধরে মাজারের এই কুমিরগুলো দর্শনার্থীদের কাছে ছিল এক বিশেষ আকর্ষণ। তবে সেই ঐতিহ্যের শেষ বংশধরের মৃত্যু হয় ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে।
ভারত থেকে আনা কুমিরেরও অবসান-
এর আগে ২০০৫ সালে ভারত থেকে কয়েকটি কুমির এনে দিঘিতে অবমুক্ত করা হয়েছিল। সময়ের ব্যবধানে সেগুলোর বেশ কয়েকটি মারা যায়। সর্বশেষ একটি কুমির ২০২৩ সালের অক্টোবরে মারা যাওয়ার পর দিঘিতে একমাত্র কুমির হিসেবে টিকে ছিল এই প্রাণীটি।
শিশুমৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনার পর অবশেষে সেই কুমিরকেও সরিয়ে নেওয়া হলো। ফলে শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের অংশ হয়ে থাকা মাজার দিঘির কুমির অধ্যায়ে আপাতত নেমে এলো এক নতুন মোড়।
