প্রতীকী ছবি
শেষ হলো পুলিশ সপ্তাহ, জোর দেওয়া হলো জনবান্ধব ও স্মার্ট পুলিশিংয়ে।
মৃত্যুর পর পরিচয়হীনভাবে দাফন—এ যেন এক নীরব ট্র্যাজেডি। স্বজনের শেষ স্পর্শ ছাড়াই প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দাফন হচ্ছে বহু অজ্ঞাত লাশ। প্রযুক্তির যুগেও বছরের পর বছর মিলছে না তাদের পরিচয়। অন্যদিকে নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে পরিবারগুলোর দৌড়ঝাঁপ চলছেই। এই দুই বাস্তবতাকে একসূত্রে আনতেই এবার বড় উদ্যোগের প্রস্তাব উঠেছে পুলিশ সপ্তাহে।
পুলিশ সপ্তাহের চতুর্থ দিনে বুধবার আইজিপির সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠকে নিখোঁজের জিডি ও অজ্ঞাত লাশ উদ্ধারের তদন্তকে সমন্বিত প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার আওতায় আনার প্রস্তাব দেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধান মোস্তফা কামাল। এ জন্য আলাদা ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরির কথাও বলা হয়েছে, যেখানে ভুক্তভোগীর স্বজনরাও তথ্য দেখার সুযোগ পাবেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এতে দ্রুত নিখোঁজ ব্যক্তিকে শনাক্ত করা সম্ভব হবে এবং কমে আসবে বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা।
বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা জানান, পিবিআই, পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) দেশের বর্তমান অপরাধ পরিস্থিতি, আগামীর চ্যালেঞ্জ এবং প্রযুক্তিনির্ভর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মতামত তুলে ধরেন।
বৈঠকে আরও জানানো হয়, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহের ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করছে সিআইডি। নিখোঁজ ব্যক্তির স্বজনদের ডিএনএ নমুনা সহজভাবে সংগ্রহের ব্যবস্থারও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে সাধারণ মানুষ যেন নিজ খরচে ডিএনএ পরীক্ষা করতে পারেন, সেই সুযোগ রাখার বিষয়ও আলোচনায় আসে।
বর্তমানে নিখোঁজের জিডি ও অজ্ঞাত লাশের ঘটনায় হওয়া মামলার তদন্ত অনেক সময় বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয়। সমন্বিত ডেটাবেজ না থাকায় তদন্তের অগ্রগতি ও তথ্য আদান-প্রদানে তৈরি হয় জটিলতা। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে পিবিআই প্রধান মোস্তফা কামাল বলেন,
“অজ্ঞাত লাশের পরিচয় শনাক্ত করে স্বজনের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। কোনো লাশ যেন পরিচয়হীন না থাকে, সে চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
তিনি জানান, তার প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শক সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত এক যুগে গড়ে প্রতি বছর ১১শ’র বেশি অজ্ঞাত লাশ দাফন করেছে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম। তবে এনআইডি সার্ভারের ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও মোবাইল ফোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনেক লাশের পরিচয় শনাক্ত করছে পিবিআই। ২০১৯ সালের পর থেকে এ কারণে বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। গত পাঁচ বছরে পিবিআই এক হাজার ৫৭৭ জন পুরুষ ও ৫৮৪ জন অজ্ঞাত নারী মৃতদেহের পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে একই সময়ে পাঁচ হাজার ৫৭৭টি লাশের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মৃত ব্যক্তির বয়স ১৮ বছরের কম হলে তিনি এনআইডিভুক্ত না-ও থাকতে পারেন। আবার কামার, কুমার, ধোপা, বাবুর্চি, নির্মাণ শ্রমিক বা ইটভাটার কর্মীদের আঙুলের রেখা ক্ষয়ে যাওয়ায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট মিলতে সমস্যা হয়। আগুনে পোড়া, গলিত বা দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত মরদেহ শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
এ কারণে পিবিআই অজ্ঞাত লাশ শনাক্তে ২২ ধরনের তথ্য সংরক্ষণের পরামর্শ দিয়েছে। পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তি ও অজ্ঞাত মরদেহের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করে একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে। এতে থানা, রেলওয়ে পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, পিবিআই, র্যাব ও পুলিশ সদরদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব ইউনিটকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শেষ হলো পুলিশ সপ্তাহ
আধুনিক, জনবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশ বাহিনী গঠনের প্রত্যয় পুনর্ব্যক্তের মধ্য দিয়ে বুধবার শেষ হয়েছে পুলিশ সপ্তাহ। বিভিন্ন কর্মঅধিবেশনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন, সাইবার নিরাপত্তা, মাদকবিরোধী অভিযান, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, কমিউনিটি পুলিশিং এবং জনসেবার মানোন্নয়নসহ গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
