বৃহস্পতিবার, ২রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

অনিয়মের গলদে থমকে ৪ হাজার কোটি টাকার সেতু প্রকল্প, প্রশ্নের কেন্দ্রে প্রকল্প পরিচালক শেখ মো. আবু জাকির সেকান্দার

স্টাফ রিপোর্টার
জুলাই ২, ২০২৬ ২:৪৬ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

৪ বছরে অগ্রগতি মাত্র ১২ শতাংশ, ১৬ সেতুর নকশাই শেষ হয়নি, ১২টির কাজ কার্যত বন্ধ—আইএমইডির প্রতিবেদনে উঠে এলো পরিকল্পনা, তদারকি ও ব্যবস্থাপনার গুরুতর দুর্বলতা। ফাইল ছবি

প্রায় ৪ হাজার ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের ৩৫টি উপজেলায় ৮২টি গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণের যে মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, বাস্তব চিত্র এখন উদ্বেগজনক। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে বাকি মাত্র এক বছর, অথচ শুরু হয়েছে মাত্র ৪৬টি সেতুর নির্মাণকাজ। আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১২ শতাংশ। ১৬টি সেতুর নকশা এখনও সম্পন্ন হয়নি, ১৬টির কাজ এক শতাংশও এগোয়নি এবং ১২টি সেতুর নির্মাণকাজ কার্যত বন্ধ রয়েছে।

এই পুরো প্রকল্পের শুরু থেকেই প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখ মো. আবু জাকির সেকান্দার। প্রকল্পের এমন ধীরগতি, পরিকল্পনাগত দুর্বলতা এবং তদারকির ব্যর্থতা নিয়ে এখন স্বাভাবিকভাবেই তার ভূমিকা ও জবাবদিহি প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

আইএমইডির প্রতিবেদনে মিলল অনিয়মের বিস্তৃত চিত্র

বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রায় প্রতিটি ধাপেই গুরুতর দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই এবং ডিপিপি প্রণয়নের সময় মাঠপর্যায়ের বাস্তব কারিগরি তথ্য, হাইড্রোলজিক্যাল ও মরফোলজিক্যাল বিশ্লেষণের যথাযথ প্রতিফলন ঘটেনি। ফলে শুরু থেকেই একাধিক প্যাকেজ বাস্তবায়নযোগ্যতা সংকটে পড়ে এবং প্রকল্পটি নানা জটিলতায় নিমজ্জিত হয়।

নিয়মিত সভা হয়নি, দুর্বল হয়েছে তদারকি

প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রতি তিন মাসে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) এবং প্রতি ছয় মাসে প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) সভা হওয়ার কথা থাকলেও চার বছরে উভয় কমিটির মাত্র চারটি করে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আইএমইডির মতে, নিয়মিত সভা না হওয়ায় সময়মতো সমস্যা শনাক্ত ও সমাধানের সুযোগ নষ্ট হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নে।

১৭ কোটি টাকা পারিশ্রমিক, তবু মাঠে ছিলেন না পরামর্শকেরা

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পে নিয়োজিত ৪৭ জন পরামর্শকের মধ্যে ১৭ জন রাজধানীতে অবস্থান করে মাঠপর্যায়ে কার্যত অনুপস্থিত ছিলেন। অথচ তারা প্রায় ১৭ কোটি টাকা পারিশ্রমিক গ্রহণ করেছেন।

মাঠপর্যায়ে নিয়মিত উপস্থিত না থাকায় নির্মাণকাজের গুণগত মান নিশ্চিত হয়নি। একাধিক সেতুতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়েছে। এমনকি পাঁচটি সেতুতে ভার্টিক্যাল অ্যালাইনমেন্ট ত্রুটির কথাও উল্লেখ করেছে আইএমইডি।

নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ

আইএমইডির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে নির্মাণকাজে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের একাধিক অভিযোগ।

কুমিল্লা সদর উপজেলার গোমতী নদীর ওপর ৩১০ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণে বালির পরিবর্তে মাটি এবং খোয়ার পরিবর্তে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। গার্ডারের রড দীর্ঘদিন খোলা অবস্থায় পড়ে থাকায় মরিচা ধরেছে এবং যথাযথ কিউরিংও করা হয়নি।

মাগুরা সদর উপজেলার ভাবনহাটি–ট্রিকারখালি সড়কের সেতুতেও চুক্তি লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে পাগলা নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতুতে পুরো নদী বাঁধ দিয়ে সাটারিং করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি

আইএমইডির ভাষ্য, নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান নিশ্চিত করা হয়নি। চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠার পরও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং প্রয়োজনীয় নজরদারির অভাবে তারা চুক্তির শর্ত অমান্য করেই কাজ চালিয়ে গেছেন।

লক্ষ্য থেকে অনেক পিছিয়ে প্রকল্প

২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পের প্রায় ৭৬ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১২ শতাংশ।

এ পর্যন্ত নির্মাণ হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মিটার সেতু, যার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৫৪ কোটি টাকা। বাকি প্রায় ১৪ হাজার ১৯৭ মিটার সেতুর কাজ এখনও অসম্পূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে সংযোগ সড়ক নির্মাণ হয়নি, ভূমি অধিগ্রহণ শেষ হয়নি এবং ১৪টি সেতুর টেন্ডার প্রক্রিয়াও শুরু হয়নি।

ডিজাইনেও প্রশ্ন

আইএমইডি উল্লেখ করেছে, ডিপিপিতে ডিজাইন ও ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালটেন্সির জন্য ১৩ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও অধিকাংশ নকশা এলজিইডির নিজস্ব ডিজাইন ইউনিট দিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং পরে বুয়েট থেকে ভেটিং নেওয়া হয়েছে। তবুও একাধিক সেতুর নকশায় ত্রুটি রয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যা বলছেন প্রকল্প পরিচালক

অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন প্রকল্প পরিচালক শেখ মো. আবু জাকির সেকান্দার। তার দাবি, জুন পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি ১৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে মাত্র তিনটি সেতুর ডিজাইন বাকি রয়েছে এবং প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে কোনো ত্রুটি ছিল না, পরামর্শকেরা প্রয়োজন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সব ঠিকাদার দায়সারা কাজ করছেন—এমন অভিযোগও সঠিক নয়। কোথাও ত্রুটি পাওয়া গেলে তা সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।

তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি

তবে আইএমইডির মূল্যায়ন স্পষ্টভাবে বলছে, দুর্বল পরিকল্পনা, অপর্যাপ্ত তদারকি, পরামর্শকদের দায়িত্বহীনতা, ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া এবং সময়মতো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থতার কারণেই প্রকল্পটি নির্ধারিত লক্ষ্য থেকে অনেক পিছিয়ে পড়েছে।

প্রকল্পটির সার্বিক বাস্তবায়নের দায়িত্ব যেহেতু প্রকল্প পরিচালকের ওপর ন্যস্ত, তাই প্রকল্পের ধীরগতি, ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা এবং অনিয়মের অভিযোগে তার ভূমিকা ও জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আইএমইডির পর্যবেক্ষণ ও প্রকল্প-সংক্রান্ত সব নথি স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করে দায় নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ