ফাইল ছবি
রাজধানীতে ভবন নির্মাণে অনিয়ম ঠেকাতে একের পর এক অভিযান চালাচ্ছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। নকশা অনুমোদন, নির্মাণ তদারকি ও পরিদর্শনে অনিয়ম, ঘুষ-দুর্নীতি এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সম্প্রতি রাজউকে অভিযানও চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পরিচালিত ওই অভিযানে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা ও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের কথা জানিয়েছে দুদক।
ঠিক এমন সময়ে রাজউকের জোন-৭-এর অথরাইজড অফিসার মো. ইলিয়াস হোসেনকে ঘিরে পুরোনো অভিযোগের সঙ্গে নতুন করে সামনে এসেছে একটি ভবনের নির্মাণকাজ বন্ধ না হওয়ার প্রশ্ন। সূত্রাপুরের মালাকারটোলায় রাজউকের মোবাইল কোর্টে অনিয়ম ধরা পড়ার পর বৈদ্যুতিক সার্ভিস লাইন বিচ্ছিন্ন ও মিটার জব্দ করা হলেও পরবর্তী সময়ে ভবনটিতে ফের নির্মাণকাজ চলার অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দার লিখিত অভিযোগও রয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনাটি এখন শুধু একটি ভবনের নির্মাণকাজ বন্ধ হয়েছে কি না—সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। বরং রাজউকের অভিযান, মিটার জব্দ, নোটিশ এবং পরবর্তী তদারকির মধ্যবর্তী সময়ে কী ঘটছে, সেটিই সামনে এসেছে বড় প্রশ্ন হিসেবে।
মিটার জব্দ, তারপরও নির্মাণকাজ
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সূত্রাপুরের ৪, ৫ ও ৬ নম্বর মালাকারটোলা লেনের একটি ১০ তলা নির্মাণাধীন ভবনে রাজউকের মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পর নির্মাণবিধির ব্যত্যয় ধরা পড়ে। বৈদ্যুতিক সার্ভিস লাইন বিচ্ছিন্ন ও মিটার জব্দ করা হলেও পরবর্তী সময়ে সেখানে আবার নির্মাণকাজ চলার অভিযোগ ওঠে। ভবনটিতে নির্ধারিত সাইডব্যাক না রাখা, পাশের ভবনের দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং প্রতিবেশী ভবন ঝুঁকিতে পড়ার অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
রাজউক জোন-৭-এর অথরাইজড অফিসার ইলিয়াস হোসেন ওই প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, ভবনটিতে একবার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে মিটার জব্দ করা হয়েছিল। ভবন মালিকপক্ষ পুনরায় বিধিবহির্ভূতভাবে নির্মাণকাজ চালালে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
মিটার পুনরায় ব্যবহারের বিষয়ে আদালতের কোনো আদেশ থাকতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দা দিলীপ কুমার দাস ২৩ এপ্রিল রাজউক জোন-৭ কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলেও প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—অভিযানের পরও যদি নির্মাণকাজ ফের শুরু হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তী নজরদারি কোথায় ছিল?
অভিযান শেষ, দায়িত্বও কি শেষ?
রাজউকের মোবাইল কোর্টের মূল উদ্দেশ্য হলো বিধিবহির্ভূত নির্মাণ বন্ধ করা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কিন্তু কোনো ভবনে অভিযান চালিয়ে মিটার জব্দ করার পরও যদি নির্মাণকাজ চলার অভিযোগ ওঠে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—অভিযানের পর ভবনটি কে পর্যবেক্ষণ করেছে, পরবর্তী পরিদর্শন হয়েছে কি না এবং বিধিবহির্ভূত নির্মাণ পুনরায় শুরু হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বের করতে প্রয়োজন মোবাইল কোর্টের আদেশ, পরিদর্শন প্রতিবেদন, মিটার জব্দের কাগজপত্র, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের নথি, ভবন মালিককে দেওয়া নোটিশ এবং পরবর্তী পরিদর্শনের প্রতিবেদন পর্যালোচনা।
ইলিয়াসকে ঘিরে অভিযোগের পুরোনো অধ্যায়
ইলিয়াস হোসেনকে ঘিরে অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০২১ সালের একটি প্রতিবেদনে রাজউক জোন-৬-এর তৎকালীন সহকারী অথরাইজড অফিসার মো. ইলিয়াসের বিরুদ্ধে নকশা অনুমোদন ও বদলির জন্য ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছিল।
ওই প্রতিবেদনে একজন আবেদনকারীর কাছ থেকে তিন দফায় মোট ১০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়। একই প্রতিবেদনে অনুমতি ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ এবং দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিতির বিষয়ে বিভাগীয় মামলার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছিল।
তবে ওই সময় ইলিয়াস এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। নকশা অনুমোদনের জন্য ১০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগকে তিনি ‘মনগড়া’ বলে দাবি করেন এবং বিল্ডিং ইন্সপেক্টরদের বদলি নিয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন।
নোটিশের পর কী হয়—প্রশ্ন সেখানেই
২০২৫ সালের আরেকটি প্রতিবেদনে ইলিয়াসের দায়িত্বাধীন এলাকায় অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে নোটিশ দেওয়ার পরও দীর্ঘ সময় কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ প্রকাশিত হয়। সেখানে ধানমন্ডি-কলাবাগান, ফার্মগেটের তেজতুরী বাজার, পূর্ব রাজাবাজার ও নিউ এলিফ্যান্ট রোডের কয়েকটি ভবনের প্রসঙ্গ উঠে আসে।
প্রতিবেদনে কলাবাগানের একটি নোটিশ ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছিল। নিউ এলিফ্যান্ট রোডের কয়েকটি ভবনে মোবাইল কোর্টের পরও নির্মাণ ও ব্যবহার চলার অভিযোগ এবং কথিত আর্থিক সমঝোতার দাবিও সেখানে প্রকাশিত হয়।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলোতে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, সেগুলো অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য।
উচ্ছেদ অভিযানের পরও যদি কাজ চলে, দায় কার?
রাজউকের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নোটিশ থেকে অভিযান, অভিযান থেকে উচ্ছেদ, মিটার বিচ্ছিন্ন থেকে পুনঃসংযোগ এবং নির্মাণ বন্ধের নির্দেশ থেকে বাস্তবায়ন—প্রতিটি ধাপের জবাবদিহি।
কোনো ভবন নকশাবহির্ভূত হলে নোটিশ দেওয়া হলো। পরে মোবাইল কোর্ট হলো। মিটার জব্দ হলো। নির্মাণ বন্ধের নির্দেশও দেওয়া হলো। কিন্তু এরপরও যদি নির্মাণকাজ চলে, তাহলে শুধু ভবন মালিকের দায় নিয়ে প্রশ্ন তুললেই বিষয়টি শেষ হয় না।
প্রশ্ন উঠবে—পরবর্তী তদারকির দায়িত্বে কে ছিলেন?
কতবার পরিদর্শন হয়েছে?
কোন কর্মকর্তা পরবর্তী প্রতিবেদন দিয়েছেন?
নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু হওয়ার তথ্য পাওয়ার পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
আর কোনো আদালতের আদেশ থাকলে সেটি রাজউকের নথিতে কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে?
দুদকের অভিযানে প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ
রাজউকের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সময়ই দুদকের অভিযান বিষয়টিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাজউকের প্রধান কার্যালয়ে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম নকশা অনুমোদন, নির্মাণ তদারকি ও পরিদর্শনে অনিয়ম, ঘুষ-দুর্নীতি এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালায়। দুদক সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই ও প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করেছে এবং পরবর্তী যাচাইয়ের পর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
অর্থাৎ, রাজউকের অনুমোদন থেকে মাঠপর্যায়ের তদারকি পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাটিই এখন নজরদারির আওতায় এসেছে।
এই বাস্তবতায় ইলিয়াসকে ঘিরে অতীতের অভিযোগ এবং মালাকারটোলার সাম্প্রতিক ঘটনা—দুটিই আলাদা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বক্তব্যে আইনগত ব্যবস্থা, মাঠে নির্মাণ চলার অভিযোগ
মালাকারটোলার ভবন প্রসঙ্গে ইলিয়াস হোসেনের বক্তব্য—আগে সেখানে মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়েছে এবং ভবন মালিকপক্ষ আবার বিধিবহির্ভূত নির্মাণ করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে স্থানীয় অভিযোগ ও প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, অভিযানের পরও নির্মাণকাজ চলেছে।
তাই এখানে ব্যক্তিগত বক্তব্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে রাজউকের সরকারি নথি বনাম মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা।
যদি নথিতে নির্মাণ বন্ধের নির্দেশ থাকে, তাহলে নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু হলো কীভাবে—এ প্রশ্নের উত্তর নথি দিয়েই পাওয়া সম্ভব।
পুরোনো অভিযোগের পুনরাবৃত্তি হলে জবাবদিহি কোথায়?
ইলিয়াসকে ঘিরে ২০২১ সালের ঘুষের অভিযোগ থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের নোটিশ ও অবৈধ নির্মাণসংক্রান্ত অভিযোগ এবং সর্বশেষ মালাকারটোলার ঘটনা—বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। একই সঙ্গে এসব অভিযোগের কিছু তিনি অস্বীকারও করেছেন।
ফলে অভিযোগের দীর্ঘ তালিকা দিয়ে কাউকে দায়ী করার চেয়ে এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিটি অভিযোগের নথিভিত্তিক যাচাই।
বিশেষ করে মালাকারটোলার ভবনটির ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্টের আদেশ, মিটার জব্দের নথি, পরিদর্শন প্রতিবেদন, পরবর্তী নির্মাণের ছবি বা ভিডিও, স্থানীয় অভিযোগ এবং আদালতের কোনো আদেশ থাকলে তার কপি পর্যালোচনা করা জরুরি।
বড় প্রশ্ন রাজউকের ভাবমূর্তি ও জবাবদিহি নিয়ে
একটি স্বায়ত্তশাসিত নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ ওঠা এবং একই ধরনের অভিযোগ নতুন ঘটনায় ফের আলোচনায় আসা—স্বাভাবিকভাবেই প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নজরদারি ও জবাবদিহি ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
বিশেষ করে দুদকের সাম্প্রতিক অভিযানের পর এই প্রশ্ন আরও প্রাসঙ্গিক—রাজউকের অভিযান কি শুধু নোটিশ, মিটার জব্দ কিংবা তাৎক্ষণিক মোবাইল কোর্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি অভিযানের পরও অবৈধ নির্মাণ বন্ধ আছে কি না তা নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা থাকবে?
মালাকারটোলার একটি ভবনকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ তাই এখন বৃহত্তর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—রাজউকের মাঠপর্যায়ের অভিযানের পর নজরদারি কোথায়, দায়বদ্ধতা কার এবং বিধিবহির্ভূত নির্মাণ চললে শেষ পর্যন্ত ব্যবস্থা নেয় কে?
এসব প্রশ্নের উত্তর নথিপত্র ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হতে পারে।
উল্লেখ্য জোন-৬/১ এর সহকারী অথরাইজড অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় একাধিক অনিয়মের তথ্য নিয়ে বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে……
