মাত্র ১৬ থেকে ২২ হাজার টাকার সরকারি বেতনে চাকরি। অথচ নামে-বেনামে কোটি টাকার ফ্ল্যাট, জমিজমা, রাজকীয় বাড়ি, বিদেশে ভাই ও সন্তানদের উচ্চশিক্ষা— সব মিলিয়ে যেন এক রহস্যময় সম্পদের সাম্রাজ্য। কর অঞ্চল-৩ ঢাকার কর্মচারী মো: জুলহাস উদ্দিন আহমেদকে ঘিরে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। অভিযোগ উঠেছে, ভুয়া স্থায়ী ঠিকানা, কাগজপত্র জালিয়াতি, পুলিশ ভেরিফিকেশন ম্যানেজ এবং সরকারি নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে বহাল তবিয়তে চাকরি করে যাচ্ছেন তিনি।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, মো: জুলহাস উদ্দিন আহমেদ প্রথমে ২৩ মে ১৯৯৩ সালে কর বিভাগে নৈশ প্রহরী হিসেবে যোগদান করেন। দীর্ঘ ৭ বছর পর ১০ সেপ্টেম্বর ২০০০ সালে অফিস সহায়ক (পিয়ন) পদে পদোন্নতি পান। এরপর টানা ২৫ বছর একই বিভাগে চাকরি করার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ৮ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে “অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক” পদে দ্বিতীয় পদোন্নতি লাভ করেন। বর্তমানে তিনি কর অঞ্চল-৩, সার্কেল-৫৯, পুরানা পল্টনে কর্মরত রয়েছেন। তার বর্তমান সর্বসাকুল্যে বেতন ২২ হাজার ৪৯০ টাকা।
কিন্তু এই স্বল্প আয়ের চাকরিজীবীর জীবনযাপন ও সম্পদের হিসাব যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প বলছে।
ভুয়া ঠিকানায় সরকারি চাকরি-অনুসন্ধানী প্রতিবেদকের হাতে আসা তথ্য-উপাত্তে দেখা যায়, জুলহাস উদ্দিন আহমেদ সরকারি চাকরিতে যোগদানের সময় নিজেকে মানিকগঞ্জ জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে দেখান।
অভিযোগ রয়েছে, কাগজপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে এই ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করেই তিনি চাকরি বাগিয়ে নেন। এমনকি চাকরি স্থায়ী করার সময় পুলিশ ভেরিফিকেশনেও ঘুষের মাধ্যমে তদন্ত রিপোর্ট নিজের অনুকূলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
কিন্তু মানিকগঞ্জে অনুসন্ধান চালিয়ে তার কোনো স্থায়ী ঠিকানার অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি। বরং অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, তার প্রকৃত স্থায়ী ঠিকানা ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর এলাকায়। তার পুরোনো এনআইডি নম্বর ১৯৭৩২৬৯৩৬২৫৬৮৮৭২৯ এবং স্মার্টকার্ড নম্বর ৬৪০০৭১৫১২১ অনুযায়ীও সেই তথ্যের সত্যতা মিলেছে।
এক ব্যক্তির তিন তিনটি স্থায়ী ঠিকানা থাকায় ঘটনা আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে যখন তার টিআইএন সার্টিফিকেট ঘেঁটে ঢাকাতেও আরেকটি স্থায়ী ঠিকানার সন্ধান পাওয়া যায়। অর্থাৎ একই ব্যক্তির নামে তিনটি পৃথক স্থায়ী ঠিকানা ব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে।
প্রশ্ন উঠেছে—একজন সরকারি কর্মচারীর কয়টি স্থায়ী ঠিকানা থাকতে পারে? কেনই বা একাধিক ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে? এর আড়ালে কি লুকিয়ে আছে আরও বড় কোনো অর্থনৈতিক কৌশল?
কর অঞ্চল নিয়েও ‘নিজের গড়ে তোলা রাজত্ব’।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য অনলাইন TIN নিবন্ধনে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী, কর্মস্থল ঢাকা ও পেশা সরকারি চাকরি দেখালে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর অঞ্চল-৪ এ অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা। ঢাকায় কর্মরত অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী সেখানেই আয়কর রিটার্ন জমা দেন।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, জুলহাস উদ্দিন আহমেদ নিজের দীর্ঘদিনের কর্মস্থল কর অঞ্চল-৩ ব্যবহার করে নিয়ম ভেঙে সেখান থেকেই নতুন TIN গ্রহণ করেছেন। যেন নিয়ম-কানুন তার ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে।
কেচো খুঁড়তে সাপ-অনুসন্ধান যত গভীরে গেছে, বেরিয়ে এসেছে তত ভয়াবহ তথ্য। ঢাকার খিলগাঁও দক্ষিণ বনশ্রী মেইন রোডের এইচ ব্লকে নিকট আত্মীয়ের নামে কোটি টাকার ফ্ল্যাট কেনার তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুরে নিজের ও ভাইদের নামে গড়ে তুলেছেন বিলাসবহুল বাড়ি। রয়েছে দামি আসবাবপত্র ও অভিজাত জীবনযাপনের নানা চিহ্ন।
অভিযোগ রয়েছে, আত্মীয়-স্বজনের নামেও বিপুল পরিমাণ জায়গা-জমি ক্রয় করেছেন তিনি।
আবার ৭ ভাইয়ের মধ্যে এক ভাইকে পাঠিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে, আরেক ভাই রয়েছেন সৌদি আরবে। অন্যদিকে নিজের ছেলেকে দেশের ব্যয়বহুল বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান East West University-এ পড়াশোনা করানোর পর বর্তমানে যুক্তরাজ্যের London Metropolitan University-এ উচ্চশিক্ষা করাচ্ছেন।
আপনারা যা পারেন নিউজ করেন আমার কিছু যায় আসেনা। সাক্ষাৎকারে যখন তাকে প্রশ্ন করা হয়—
“৭ বছর নৈশ প্রহরী এবং ২৫ বছর পিয়ন পদে চাকরি করে এত বিপুল সম্পদের মালিক হলেন কীভাবে?
তখন তিনি স্পষ্ট কোনো উত্তর না দিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান।
আরও প্রশ্ন করা হয়-আপনার মাসিক বেতন যেখানে ১৬-২২ হাজার টাকা, সেখানে লাখ লাখ টাকার জীবনযাপন, বিদেশে পড়াশোনা ও সম্পদের উৎস কী?
এরও জবাব দেননি তিনি। উল্টো দাম্ভিকতা প্রকাশ করে বলেন—আপনারা যা পারেন নিউজ করেন।
সমাজসেবার আড়ালে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ-অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সুলতানপুর এলাকায় বিভিন্ন খেলাধুলা, স্কুল ও সামাজিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত অনুদান দেন জুলহাস উদ্দিন আহমেদ। প্রায়ই তাকে বিশেষ অতিথি হিসেবে মঞ্চে দেখা যায়। বিতরণ করেন উপহার ও নগদ সহায়তা। স্থানীয়দের প্রশ্ন—
একজন স্বল্প বেতনের সরকারি কর্মচারীর এমন আর্থিক সামর্থ্যের উৎস কোথায়?
সচেতন মহলের উদ্বেগ-দেশের সচেতন মহলের মতে, এ ধরনের অভিযোগ শুধু একজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে নয়— এটি পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্যও উদ্বেগজনক বার্তা। যদি অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে ভুয়া তথ্য দিয়ে চাকরি গ্রহণ, রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতারণা, কর ব্যবস্থার অপব্যবহার এবং অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের মতো গুরুতর বিষয় জড়িত থাকতে পারে।
তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যেন অবিলম্বে বিষয়টি তদন্তের আওতায় এনে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
উল্লেখ্য যে,এ দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে পুরো এনবিআর কর্মকর্তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করে আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো উচিৎ। এমনটাই দাবি সংশ্লিষ্ট মহলের।
