ঘরে তখন বিয়ের শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা। এক কক্ষে মাদ্রাসার দশম শ্রেণির এক কিশোরীকে বধূর সাজে প্রস্তুত করছিলেন স্বজনরা। পাশের ঘরে এসএসসি পরীক্ষার্থী কিশোর বরের বেশে বসে কাজির অপেক্ষা করছিল। উঠানে রান্নার ধোঁয়া, অতিথিদের আনাগোনা আর স্বজনদের ব্যস্ততায় মুখর ছিল পুরো বাড়ি।
কিন্তু ঠিক সেই সময়ই ঘটে নাটকীয় এক ঘটনা।
কাজি আসার আগেই পুলিশ সদস্যদের নিয়ে হঠাৎ সেখানে উপস্থিত হন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফারজানা আখতার। প্রশাসনের উপস্থিতি টের পেতেই মুহূর্তের মধ্যে পালিয়ে যান বর-কনের মা-বাবাসহ বরযাত্রী ও অনেক স্বজন। আর তাতেই ভেস্তে যায় গোপনে আয়োজন করা বাল্যবিয়ের পুরো আয়োজন।
মঙ্গলবার রাত পৌনে ১২টার দিকে কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের খোর্দবন গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কনে একটি মাদ্রাসার দশম শ্রেণির ছাত্রী এবং বর একই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, যিনি এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন। প্রায় দেড় বছর আগে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে পরিবারকে বিয়ের জন্য চাপ দিতে শুরু করে তারা। এমনকি বিয়ে না দিলে আত্মহত্যার হুমকিও দেয় বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। পরিস্থিতির চাপে পড়ে দুই পরিবার গোপনে বিয়ের আয়োজন করে।
তবে শেষ মুহূর্তে প্রশাসনের অভিযানে থেমে যায় সেই আয়োজন।
কিশোরীর বাবা জানান, একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার সুবাদে ছেলে-মেয়ের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয়। পরে তারা আত্মহত্যার হুমকি দিলে পরিবার বিয়ের প্রস্তুতি নিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বিয়ে বন্ধ হয়েছে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে আর বিয়ে দেওয়া হবে না।
অভিযান শেষে প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্বজনদের কাছ থেকে মৌখিক অঙ্গীকার নেন যে, আইনগত বয়স পূর্ণ হওয়ার আগে এই যুগলের বিয়ে দেওয়া হবে না। এরপর তাদের পরিবারের জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়।
কুমারখালীর ইউএনও ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফারজানা আখতার বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে বাল্যবিয়ের আয়োজন বন্ধ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পরিবারকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে বিয়ে না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাল্যবিয়ের বিষয়ে প্রশাসনের অবস্থান জিরো টলারেন্স। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে পরিবার, সমাজ এবং স্থানীয় জনগণকে আরও সচেতন হতে হবে।
শেষ মুহূর্তে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে থেমে যাওয়া এই বাল্যবিয়ের ঘটনা এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কাজি আসার আগেই ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতি যেন বদলে দিল দুই কিশোর-কিশোরীর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের গতি।
