শনিবার, ৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

খুলনায় ১৮১ সন্ত্রাসীর তালিকা, কিন্তু নেই ‘গডফাদার’দের নাম,তিন দিনের যৌথ অভিযানে গ্রেপ্তার ১২৯, তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ধরা পড়েছে মাত্র দুজন

খুলনা জেলা প্রতিনিধি
জুন ৬, ২০২৬ ৯:৪৭ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

লিটন, রিফাত

খুলনা মহানগরীতে একের পর এক প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড, গুলি ও কুপিয়ে জখমের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে নগরীর আটটি থানাভিত্তিক ১৮১ জন সন্ত্রাসীর একটি নতুন তালিকা তৈরি করেছে পুলিশ। তবে আলোচিত এই তালিকায় সন্ত্রাসীদের অর্থদাতা, অস্ত্র সরবরাহকারী কিংবা কথিত ‘গডফাদার’দের নাম না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে এর কার্যকারিতা নিয়ে।

এরই মধ্যে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ২ জুন রাত থেকে যৌথ অভিযান শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত তিন দিনে মাদক ব্যবসায়ীসহ মোট ১২৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের মধ্যে ধরা পড়েছে মাত্র দুজন—কসাই লিটন ও আজম খান।

অপরাধের ছায়ায় খুলনা

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন পুলিশের কার্যক্রম সীমিত থাকায় বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসী চক্র নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠে। আধিপত্য বিস্তার, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে এসব গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ বাড়তে থাকে। এর ফল হিসেবে দিনদুপুরে খুন, গোলাগুলি ও ধারালো অস্ত্রের হামলার ঘটনা নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে।

খুলনা মহানগর পুলিশের অপরাধ শাখার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত ২২ মাসে মহানগরীতে ৮৮টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪টি হত্যার ঘটনায় সরাসরি বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

থানাভিত্তিক সন্ত্রাসীদের নতুন তালিকা

সদর থানা: শীর্ষে ‘গ্রেনেড বাবু’

সদর থানার তালিকায় রয়েছে ২৭ জন সন্ত্রাসীর নাম। তালিকার এক নম্বরে রয়েছেন রনি চৌধুরী ওরফে ‘গ্রেনেড বাবু’। তাঁর বিরুদ্ধে ১৪টি মামলা রয়েছে, যার মধ্যে ১১টি বিচারাধীন। একটি মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হয়ে বর্তমানে তিনি পলাতক।

পুলিশের দাবি, গ্রেনেড বাবুর অনুসারীরা এখনও বিভিন্ন এলাকায় অপরাধ ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। সদর, লবণচরা, সোনাডাঙ্গা ও হরিণটানা এলাকায় তাঁর নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে বলে তথ্য রয়েছে।

তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন নূর আজিম। তাঁর বিরুদ্ধে ১৬টি মামলা রয়েছে। কারাগারে থাকলেও অনুসারীদের মাধ্যমে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া পলাশ শেখ, আশিক, বিসমিল্লাহ, সজীব, গলাকাটা রাজু, ঠুন্ডা শামীম, সৌরভ সাহা জনি ও ফয়সাল খানের নামও তালিকায় রয়েছে।

সোনাডাঙ্গা থানা: আলোচিত কয়েকটি নাম

সোনাডাঙ্গা থানার তালিকায় ২১ জন সন্ত্রাসীর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন হাড্ডি সাগর, ঢাকাইয়্যা শামীম, কালা লাভলু, সৌরভ গাজী, চিংড়ি পলাশ, কালা তুহিন, ব্ল্যাক রাজু, আলী নূর ডাবলু ও কাবা রনি।

দৌলতপুর থানা: ৩১ জনের তালিকা

দৌলতপুর থানার তালিকায় ৩১ জনের নাম রয়েছে। আলোচিতদের মধ্যে আছেন ইমন হাওলাদার, আসিফ মোল্লা, টেরা আসলাম, আরমান, হুমায়ুন কবির হুমা, মমি, আজম শেখ, এলকো রিপন, মিল্লাত গাজী, রায়হান ও শাহরিয়ার।

খালিশপুর থানা: সবচেয়ে আলোচিত ‘ট্যাংকি শাওন’

খালিশপুর থানার ৩৬ জনের তালিকায় প্রথমেই রয়েছে ট্যাংকি শাওনের নাম। এছাড়া পলাশ হাওলাদার, ওয়াজিব ইসলাম রাকিব, নয়ন, সাঈদ ও নবাবও রয়েছেন তালিকাভুক্তদের মধ্যে।

লবণচরা থানা: সর্বোচ্চ ৪৫ জন

লবণচরা থানায় সবচেয়ে বেশি, ৪৫ জন সন্ত্রাসীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তালিকায় রয়েছে কাউয়া মিরাজ, আরিফুজ্জামান রাজ, হাসিব হোসেন, পালসার সোহেল, ব্লেড বাবু ও মোটা সবুজের মতো পরিচিত নাম।

আড়ংঘাটা, হরিণটানা ও খানজাহান আলী

আড়ংঘাটা থানার তালিকায় ১৫ জন, হরিণটানা থানায় চারজন এবং খানজাহান আলী থানায় দুজন সন্ত্রাসীর নাম রয়েছে। এসব তালিকায় জুয়েল সরদার, রানা শেখ, সুজন সরকার, ছোট শাহীন, আজম তালুকদার, দেলোয়ার হোসেন, ইমাদ মোল্লা, বিল্লু, জাফরিন ও জাহিদুল ইসলাম লাল্টুর নাম রয়েছে।

ছবিসহ তৈরি হয়েছে পূর্ণাঙ্গ ডেটাবেজ

তালিকা তৈরির তদারকিতে থাকা রাশিদুল ইসলাম খান জানান, আগে অনেক সন্ত্রাসীর পূর্ণাঙ্গ তথ্য পুলিশের কাছে ছিল না। এবার তাদের ছবি, ঠিকানা, মামলার বিবরণ ও অন্যান্য তথ্য সমন্বয়ে একটি ডেটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, তালিকা তৈরির পরই অভিযান শুরু হয়েছে। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

‘গডফাদার’রা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে

নগরীর বিভিন্ন অপরাধ বিশ্লেষণকারী মহলের মতে, মাঠপর্যায়ের সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি তাদের অর্থদাতা, অস্ত্র সরবরাহকারী ও রাজনৈতিক-সামাজিক পৃষ্ঠপোষকদেরও চিহ্নিত করা জরুরি। কিন্তু নতুন তালিকায় এসব প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম নেই।

এ বিষয়ে রাশিদুল ইসলাম খান বলেন,  এটি প্রাথমিক তালিকা। নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে। ভবিষ্যতে অস্ত্র সরবরাহকারী ও অন্যান্য সহযোগীদেরও শনাক্ত করা হবে।

তিন দিনে গ্রেপ্তার ১২৯

যৌথ অভিযানের প্রথম দিন সাতজনকে গ্রেপ্তারের পর র‌্যাব, এপিবিএন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সম্পৃক্ত করা হয়। তাদের কাছেও তালিকা সরবরাহ করা হয়েছে।

৪ জুন গ্রেপ্তার করা হয় ৬৩ জনকে। পরদিন আরও ৫৯ জনকে আটক করা হয়। সব মিলিয়ে তিন দিনে গ্রেপ্তার হয়েছেন ১২৯ জন। তবে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ধরা পড়েছেন মাত্র দুজন—কসাই লিটন ও আজম খান।

‘খুলনা এখন আতঙ্কের শহর’ নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন,  খুলনা এখন আতঙ্কের শহরে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও গোলাগুলি, চাঁদাবাজি বা অপহরণের খবর পাওয়া যাচ্ছে। সন্ত্রাস দমনে পুলিশের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।

অন্যদিকে মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, গ্রেনেড বাবুর সহযোগীসহ একাধিক আলোচিত আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অভিযান চলমান থাকবে।

তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে শুধু পুলিশের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। সমাজকর্মী, রাজনৈতিক নেতা ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতাও প্রয়োজন। মানুষ যদি মামলা ও তদন্তে সহযোগিতা না করে, তাহলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

শেষ কথা : ১৮১ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে খুলনায় অপরাধ দমনের নতুন অধ্যায় শুরু হলেও প্রশ্ন রয়ে গেছে—মাঠের সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি তাদের নেপথ্যের অর্থদাতা ও পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কবে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হবে? নগরবাসী এখন সেই উত্তরই খুঁজছে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।