শনিবার, ৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

গ্রামীণ স্মৃতি, মায়ের টান আর শেকড়ের গল্পে পটুয়াখালীতে ষষ্ঠ নাইওর উৎসব

পটুয়াখালী জেলা প্রতিনিধি
জুন ৬, ২০২৬ ৬:৩৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বাংলার মাটি, মানুষের আবেগ আর হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ সংস্কৃতির অনন্য এক অধ্যায়ের নাম ‘নাইওর’। সেই চিরচেনা মায়ের বাড়ি ফেরার আনন্দ, আত্মীয়-স্বজনের মিলনমেলা আর লোকজ ঐতিহ্যের আবেগঘন স্মৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে পটুয়াখালীতে বর্ণাঢ্য আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ষষ্ঠ ‘নাইওর উৎসব’।

দক্ষিণাঞ্চলের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘দখিনের কবিয়াল’-এর উদ্যোগে আয়োজিত দিনব্যাপী এ উৎসব পরিণত হয় গ্রামীণ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পারিবারিক বন্ধনের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায়।

শুক্রবার (৬ জুন) সকালে পটুয়াখালী সার্কিট হাউস প্রাঙ্গণ থেকে একটি বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে গিয়ে শেষ হয়। রঙিন ব্যানার, লোকজ সাজসজ্জা ও উৎসবমুখর অংশগ্রহণে পুরো শহর যেন ফিরে যায় বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতির আবহে।

পরে মোমবাতি প্রজ্বালনের মাধ্যমে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। দিনব্যাপী আয়োজনে ছিল লোকসংগীত, নৃত্য, কবিতা আবৃত্তি ও নানা সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন দেশের বরেণ্য কণ্ঠশিল্পী রবি চৌধুরী, যার পরিবেশনায় দর্শক-শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে অতীতের স্মৃতিময় বাংলায় যেন ফিরে যান। স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনাও উৎসবকে করে তোলে প্রাণবন্ত ও উপভোগ্য।

বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতিতে ‘নাইওর’ শুধু একটি শব্দ নয়, এটি আবেগ, ভালোবাসা ও পারিবারিক বন্ধনের এক চিরন্তন প্রতীক। গ্রামীণ বাংলায় বিবাহিত মেয়েদের স্বামীর বাড়ি থেকে কিছুদিনের জন্য বাপের বাড়ি বেড়াতে আসাকেই বলা হতো ‘নাইওর’। সেই সময় যাতায়াতের আধুনিক ব্যবস্থা না থাকায় গরুর গাড়ি, পালকি কিংবা নৌকায় চড়ে মেয়েরা ফিরে আসতেন শৈশবের আপন ঠিকানায়।

নাইওরকে ঘিরে বাড়িতে সৃষ্টি হতো উৎসবের আমেজ। মায়েরা মেয়ের জন্য তৈরি করতেন নানা রকম পিঠা-পুলি, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের আনাগোনায় মুখর হয়ে উঠত পুরো গ্রাম। সন্ধ্যায় বসত গানের আসর, গল্প আর আনন্দের আয়োজন। গ্রামীণ নারীদের জন্য এটি ছিল এক বিশেষ আনন্দময় ও মানসিক প্রশান্তির উপলক্ষ।

কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, নগরায়ণ ও যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততায় সেই আবেগঘন সামাজিক রীতিটি আজ প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। তাই এই উৎসব শুধু একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার এক আন্তরিক প্রয়াস।

উৎসব কমিটির আহ্বায়ক ও পটুয়াখালী জেলা পরিষদের প্রশাসক সেহাংশু সরকার কুট্টি-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন ‘দখিনের কবিয়াল’-এর সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসাইন মানিক। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক ড. মো. শহীদ হোসেন চৌধুরী, পুলিশ সুপার মো. আবু ইউসুফসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

উৎসবে অংশ নেওয়া দর্শনার্থীরা জানান, এই আয়োজন তাদের হৃদয়ে নাড়া দিয়েছে। অনেকেই ফিরে পেয়েছেন শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি, যৌথ পরিবারের হারিয়ে যাওয়া আনন্দ আর গ্রামীণ জীবনের নির্মল সৌন্দর্য। তাদের মতে, নতুন প্রজন্মকে বাংলার শেকড়, সংস্কৃতি ও পারিবারিক মূল্যবোধের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে এমন আয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নাইওর উৎসব যেন শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়—এটি বাংলার হারিয়ে যেতে বসা আবেগ, পারিবারিক বন্ধন এবং লোকজ ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার এক হৃদয়ছোঁয়া অঙ্গীকার।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।