রাজস্ব বাড়ানোর বড় পরিকল্পনা থেকে হঠাৎই সরে এল সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সম্পদ কর আরোপ, আবাসন খাতে শর্তসাপেক্ষে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ এবং মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর অগ্রিম আয়কর (এআইটি) বসানোর যে আলোচনা চলছিল, শেষ মুহূর্তে তার সবকটিই বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
সম্পদ কর নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ‘না’
রাজস্ব আয় বাড়াতে সম্পদ কর আরোপ করে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা ছিল এনবিআরের। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে একটি কাঠামোও প্রস্তুত করা হয়েছিল। তবে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে আপাতত এ ধরনের কর আরোপের বিষয়ে ইতিবাচক সম্মতি না পাওয়ায় পরিকল্পনাটি স্থগিত করা হয়েছে।
এনবিআর সূত্র জানায়, করদাতাদের আয়কর রিটার্নে ঘোষিত নিট সম্পদের ভিত্তিতে কর নির্ধারণের চিন্তা ছিল। প্রস্তাব অনুযায়ী চার কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদ করমুক্ত রাখা হতো। এরপর ধাপে ধাপে সম্পদের পরিমাণ অনুযায়ী শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপের পরিকল্পনা ছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সম্পদ কর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পর্যালোচনা ও আলোচনা হয়েছে। তবে আপাতত সরকার এ বিষয়ে এগোতে আগ্রহী নয়।
বাইকারদের আন্দোলনের পর পিছু হটল সরকার
১১০ সিসির বেশি মোটরসাইকেলের ওপর অগ্রিম আয়কর আরোপের প্রাথমিক পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। রাইড-শেয়ারিং চালক ও বাইকাররা এনবিআর কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভও করেন।
জনদুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শেষ পর্যন্ত মোটরসাইকেলের ওপর নতুন কর আরোপের পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে। তবে ১৬৫ সিসির বেশি ইঞ্জিন ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেলের মালিকদের জন্য টিআইএন (TIN) বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
অটোরিকশার ওপরও থাকছে না নতুন কর
দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে করের আওতায় আনার পরিকল্পনাও ছিল সরকারের। প্রস্তাব অনুযায়ী—
সিটি করপোরেশন এলাকায় বছরে ৫ হাজার টাকা,
পৌরসভা এলাকায় ২ হাজার টাকা,
ইউনিয়ন পর্যায়ে ১ হাজার টাকা
অগ্রিম আয়কর নির্ধারণের চিন্তা করা হয়েছিল।
তবে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার কারণে এ প্রস্তাবও বাদ দেওয়া হয়েছে।
কালো টাকা সাদা করার সুযোগও থাকছে না
জমি, ফ্ল্যাট কিংবা বাণিজ্যিক স্পেস কেনাবেচার ক্ষেত্রে অপ্রদর্শিত আয় বা কালো টাকা বৈধ করার একটি বিশেষ সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। প্রস্তাব অনুযায়ী ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়কে প্রকৃত মূল্য আয়কর রিটার্নে দেখিয়ে নির্ধারিত কর পরিশোধ করতে হতো।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সরকার সেই পথেও হাঁটছে না। ফলে এবারের বাজেটে কালো টাকা সাদা করার কোনো বিশেষ সুযোগ থাকছে না।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া মনে করেন, সম্পদ কর বৈষম্য কমাতে সহায়ক হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ জটিল। তাঁর মতে, সরাসরি সম্পদ কর প্রশাসনিক চাপ বাড়াতে পারে, এমনকি পুঁজি পাচারের ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, সম্পদ গোপনের সুযোগ বন্ধ করতে হবে। কারণ সম্পদের তথ্য স্বচ্ছ হলে আয় গোপন করা কঠিন হয়ে পড়বে এবং কর ফাঁকিও কমবে।
অন্যদিকে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, তাৎক্ষণিকভাবে সম্পদ কর না আনার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে এ ধরনের কর চালুর বিষয়ে আগাম বার্তা দেওয়া যেতে পারে।
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এতে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে না; বরং দুর্নীতি উৎসাহিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই এ ধরনের সুবিধা না থাকাই দেশের জন্য ভালো।
শেষ মুহূর্তের বাজেট বার্তা
সব মিলিয়ে এবারের বাজেটে সম্ভাব্য তিনটি আলোচিত পদক্ষেপ—সম্পদ কর, মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার ওপর নতুন কর এবং কালো টাকা সাদা করার বিশেষ সুযোগ—কোনোটিই থাকছে না। ফলে স্বস্তি পেয়েছেন সাধারণ করদাতা, বাইকার ও পরিবহন খাতসংশ্লিষ্টরা। তবে দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আয় বাড়াতে সরকার বিকল্প কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই এখন নজর অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহলের।
