নিয়োগ থেকে পদোন্নতি, হোটেল বিলিং থেকে বিমানবন্দরের সিসিটিভি—উঠছে নানা প্রশ্ন; অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি। মাসুদা খানম। ছবি সংগৃহীত
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সহকারী ব্যবস্থাপক (গ্রাউন্ড সার্ভিস ডিপার্টমেন্ট) মাসুদা খানমকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। জাল ও টেম্পারিং করা শিক্ষাগত সনদ ব্যবহার করে চাকরিতে যোগদান, বয়সের তথ্য নিয়ে অসঙ্গতি, প্রভাব খাটিয়ে পদোন্নতি ও দায়িত্ব বাগিয়ে নেওয়া, আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর সিসিটিভি ফুটেজ ব্যবহারের মতো অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
মাসুদা খানম (পি#৩৬৫০০) গোপালগঞ্জের বাসিন্দা এবং বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গ্রাউন্ড সার্ভিস ডিপার্টমেন্টে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত। অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক ও পারিবারিক প্রভাবের মাধ্যমে তিনি বিমানে চাকরি ও নানা সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন। বর্তমানে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পরও তিনি নতুন রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পরিচয় দিয়ে একইভাবে প্রভাব বিস্তার করছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযুক্তের বক্তব্যও এ বিষয়ে পাওয়া যায়নি।
নিয়োগেই কি ছিল বয়স ও সনদ জালিয়াতি?
অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি তাঁর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে নিয়োগকে ঘিরে। অভিযোগ রয়েছে, ১৯৯৯ সালে গ্রাহক সেবা বিভাগের ট্রাফিক অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে যোগদানের সময় নির্ধারিত বয়সসীমা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা পূরণে তাঁর সমস্যা ছিল। এ কারণে এসএসসি সনদে জন্মতারিখ পরিবর্তন করে বয়স কম দেখানোর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, তাঁর এসএসসি সনদে হাতের লেখার অসঙ্গতি এবং জন্মতারিখে ঘষামাজার চিহ্ন রয়েছে। ফরিদপুরের একটি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৮৫ সালে বিজ্ঞান বিভাগে দ্বিতীয় বিভাগে এসএসসি পাস করার তথ্য পাওয়া গেলেও পরবর্তী শিক্ষাজীবন নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
বিশেষ করে ১৯৯১ সালে বান্দরবানের লামা কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে প্রথম বিভাগে এইচএসসি পাসের সনদটি নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। এসএসসি পাসের ছয় বছর পর এইচএসসি পরীক্ষায় ‘নিয়মিত’ শিক্ষার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ, সনদে ‘নিয়মিত’ শব্দের বানান এবং সাল লেখায় ঘষামাজার অভিযোগ তুলে সনদটির সত্যতা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, এইচএসসি সনদে একাধিক ধরনের হাতের লেখার অস্তিত্ব রয়েছে এবং রোল নম্বরসংক্রান্ত তথ্যেও অসঙ্গতি দেখা যায়। একইভাবে ডিগ্রি পাসের সনদেও ঘষামাজা ও টেম্পারিংয়ের অভিযোগ রয়েছে।
তবে সনদগুলো প্রকৃতপক্ষে জাল বা পরিবর্তিত কি না, তা কেবল সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল রেকর্ড যাচাই করলেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
চাকরির ২৭ বছর পরও প্রশ্নের শেষ নেই
অভিযোগ রয়েছে, ১৯৯৯ সালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে যোগদানের পর মাসুদা খানম ট্রাফিক শাখার গ্রাহক সেবা বিভাগে অল্প সময় কাজ করেন। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন হোটেল বিলিং সেকশনে দায়িত্ব পালন করেন।
এমনকি সার্ভিস ডিপার্টমেন্টের অন্যান্য শাখায় তাঁর অভিজ্ঞতা ও দায়িত্ব পালনের বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে একই ধরনের দায়িত্ব পালন করায় তাঁকে ঘিরে একটি বিশেষ প্রভাববলয় তৈরি হয়েছে।
শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও পদোন্নতি নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত মাসুদা খানম বিমান শ্রমিক লীগের চাঁদা নিয়মিত প্রদান করেছেন। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে তিনি সহকারী ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি পান।
পদোন্নতির পর ঢাকার বাইরে বদলি এবং শেরাটন হোটেলের বিল বাবদ প্রায় ৩০ লাখ টাকা পরিশোধসংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি দুদক পর্যন্ত গড়িয়েছিল—এমন দাবিও করা হয়েছে।
পরবর্তীতে তিনি ফ্লাইট অপারেশন বিভাগে বদলি হন। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে পদোন্নতি, বদলি, বিল অনুমোদন, ভাউচার ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা।
১৪ আগস্টের সেই বিমানবন্দর: মাসুদা ও তাঁর স্বামীর উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন
২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বিমানবন্দরে আটক হওয়ার ঘটনাকে ঘিরেও মাসুদা খানমের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই দিন তাঁর নির্ধারিত দায়িত্ব ট্রাফিক শাখায় না থাকা সত্ত্বেও তিনি মুখে মাস্ক পরে ফ্লাইট অপারেশন শাখা থেকে টার্মিনাল এলাকায় যান। একই সময়ে সিভিল এভিয়েশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত তাঁর দ্বিতীয় স্বামীও টার্মিনালে উপস্থিত হন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, জুনাইদ আহমেদ পলককে দেশত্যাগে সহায়তার উদ্দেশ্যে ওই দম্পতি বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন এবং এ জন্য ৫ কোটি টাকা লেনদেনের কথাও ছড়িয়ে পড়ে। তবে এই অর্থ লেনদেন কিংবা দেশত্যাগে সহায়তার অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে উপস্থাপিত হয়নি।
তাই ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে ওই দিনের ডিউটি রোস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রবেশ-প্রস্থান রেকর্ড, নিরাপত্তা লগ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
সিসিটিভি ফুটেজ কোথায় গেল—উঠছে আরও বড় প্রশ্ন
অভিযোগের আরও গুরুতর অংশ বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর এলাকার সিসিটিভি ফুটেজকে ঘিরে। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাব খাটিয়ে বিমানবন্দরের অভ্যন্তরের স্পর্শকাতর এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও তৃতীয় পক্ষের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে।
এমন অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও সামনে চলে আসবে।
অভিযোগকারীরা বলছেন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ সিসিটিভি। এ ধরনের ফুটেজ অনুমোদন ছাড়া বাইরে গেলে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কাঠামো, নিরাপত্তা প্রটোকল এবং আন্তর্জাতিক অডিটের ওপরও প্রশ্ন উঠতে পারে।
তবে ঢাকা বিমানবন্দরের ICAO-সংক্রান্ত মানদণ্ড বা শ্রেণিবিন্যাসের সঙ্গে কথিত সিসিটিভি ফুটেজ সরবরাহের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি ও তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
CAAB পাস ব্লকের হুমকির অভিযোগ
মাসুদা খানম তাঁর স্বামীর প্রভাব ব্যবহার করে বিমানবন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের CAAB পাস ব্লক বা বাতিল করে দেওয়ার হুমকি দেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া প্রশাসন, সরকার ও দুদকে প্রভাবশালী আত্মীয়স্বজন রয়েছে বলে তিনি বিভিন্ন সময় দাবি করেন, এমন অভিযোগও করেছেন অভিযোগকারীরা। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য ও লিখিত অভিযোগ সংগ্রহের দাবি উঠেছে।
অফিস আদেশ ছাড়াই হোটেল বিলিংয়ে যোগদানের অভিযোগ
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে গ্রাহক সেবা বিভাগে ফেরার পর মাসুদা খানমকে হোটেল বিলিং শাখায় দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি শ্রমিক সংগঠনের সাবেক নেতার চাপ ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এমনকি অফিস আদেশ বা রোস্টার ছাড়াই তিনি হোটেল বিলিং শাখায় যোগদান করেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। পদায়নসংক্রান্ত অফিস আদেশ, রোস্টার ও উপস্থিতির নথি পরীক্ষা করলেই এ অভিযোগের সত্যতা স্পষ্ট হতে পারে।
একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে এত অভিযোগ—তদন্ত কি জরুরি নয়?
জাল সনদ থেকে শুরু করে বয়সের অসঙ্গতি, নিয়োগ ও পদোন্নতি, আর্থিক অনিয়ম, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা তথ্য এবং সিসিটিভি ফুটেজ—একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে এতগুলো অভিযোগ ওঠায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি আছে কি না।
অভিযোগকারীদের দাবি, ২৭ বছর ধরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মতো একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা একজন কর্মকর্তার নিয়োগ থেকে বর্তমান দায়িত্ব পর্যন্ত পুরো চাকরিজীবনের নথি একবার নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হলেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসতে পারে।
তাঁদের দাবি, শিক্ষাগত সনদের মূল কপি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডে পাঠিয়ে যাচাই, জন্মতারিখের তথ্য পরীক্ষা, নিয়োগের সময়কার বয়স ও যোগ্যতা যাচাই, পদোন্নতি ও বদলির নথি পর্যালোচনা, আর্থিক লেনদেনের হিসাব পরীক্ষা এবং বিমানবন্দরের সিসিটিভি ব্যবস্থাপনা নিয়ে পৃথক তদন্ত করা হোক।
রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে অভিযোগগুলো দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত মাসুদা খানমের বিরুদ্ধে উত্থাপিত কোনো অভিযোগকেই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
