রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের টেন্ডার ব্যবস্থাকে ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারের গুরুতর অভিযোগ। ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের দাবি, রেলওয়ের বিভিন্ন দপ্তর থেকে টেন্ডার পাওয়ার পর মূল বাজেটের ২ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ ‘কমিশন’ হিসেবে দিতে হয়। দাবিকৃত অর্থ পরিশোধ না করলে কার্যাদেশ পাওয়া থেকে শুরু করে টেন্ডার বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয় ঠিকাদারদের।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল ঠিকাদার অ্যাসোসিয়েশন। ঠিকাদারদের একটি অংশের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও নেতাদের নাম ব্যবহার করে সংগঠনটির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে অর্থ আদায়ের একটি কাঠামো গড়ে উঠেছে। আর এর অন্যতম নিয়ন্ত্রক হিসেবে তারা ঠিকাদার মো. শাহ আলমের নাম উল্লেখ করছেন।
‘বাবরের পর নিয়ন্ত্রণ শাহ আলমের’—ঠিকাদারদের অভিযোগ
ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রেলওয়ে ঠিকাদার অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে টেন্ডার থেকে কমিশন আদায়ের অভিযোগ ছিল চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগ নেতা হিসেবে পরিচিত হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের বিরুদ্ধে। সে সময় শাহ আলম তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাবর আত্মগোপনে চলে গেলে ঠিকাদারদের মধ্যে সাময়িক স্বস্তি তৈরি হয়। তবে সেই স্বস্তি বেশি দিন স্থায়ী হয়নি বলে দাবি তাদের। অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তী সময়ে আগের কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন শাহ আলম।
পরবর্তীতে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি নেতা শফিকুর রহমান স্বপনকে আহ্বায়ক এবং শাহ আলমকে সদস্য সচিব করে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল ঠিকাদার অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক কমিটি সামনে আসে। ঠিকাদারদের অভিযোগ, সংগঠনটির নেতৃত্বে নিয়মিত নির্বাচন না হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট মহলের নিয়ন্ত্রণ বজায় রয়েছে।
নিবন্ধন নেই, নেই অর্থের স্বচ্ছ হিসাব-
ঠিকাদারদের দাবি, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ঢাকা ও চট্টগ্রাম মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ নিবন্ধিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু তাদের প্রতিনিধিত্বকারী ঠিকাদার অ্যাসোসিয়েশনের বৈধ রেজিস্ট্রেশন রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সংগঠনটির আয়-ব্যয়, সদস্যদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ এবং সেই অর্থ কোন খাতে ব্যয় করা হয়—এসবের স্বচ্ছ হিসাব সাধারণ ঠিকাদারদের সামনে উপস্থাপন করা হয় না।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে টেন্ডারের মূল বাজেটের ২–৩ শতাংশ অর্থ নিয়ে। ঠিকাদারদের অভিযোগ, এই অর্থ নিয়মিতভাবে আদায় করা হলেও এর কোনো প্রকাশ্য হিসাব নেই।
‘রেলের রাজা’ থেকে ‘চাঁদাবাজ শাহ আলম’—নানা পরিচয়ে আলোচনায়
ঠিকাদারদের একটি অংশ শাহ আলমকে ‘রেলের রাজা’, ‘মাফিয়া শাহ আলম’, ‘চাঁদাবাজ শাহ আলম’ ও ‘টেন্ডারের গডফাদার’সহ বিভিন্ন নামে অভিহিত করেন। তবে এসব পরিচয় ও অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার দাবি তুলে রেলওয়ের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব বিস্তার করেন শাহ আলম। এমনকি বিগত সরকারের সময়ে তৎকালীন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রদর্শন করে নিজের প্রভাবের জানান দিতেন বলেও দাবি করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার।
সরকার পরিবর্তনের পর তার রাজনৈতিক অবস্থানেও পরিবর্তন এসেছে বলে অভিযোগ ঠিকাদারদের। তাদের ভাষ্য, পরিচয় বদলালেও রেলওয়ের টেন্ডারকেন্দ্রিক প্রভাব বিস্তার ও অর্থ আদায়ের অভিযোগের ধারাবাহিকতা থামেনি।
প্রকৌশল থেকে কমার্শিয়াল—সব টেন্ডারেই ‘কমিশন’?
ঠিকাদারদের অভিযোগ, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রকৌশল বিভাগ, কমার্শিয়াল বিভাগ, সরঞ্জাম ক্রয়, ভূ-সম্পত্তি ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিভাগের টেন্ডার থেকেই ২–৩ শতাংশ হারে অর্থ আদায়ের চাপ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, টেন্ডার পাওয়ার পর দাবিকৃত হারে নগদ টাকা দিতে হয়। না দিলে কার্যাদেশ পেতে নানা ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
অপর এক ঠিকাদারের দাবি, টেন্ডার পাওয়ার পর নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন টেবিলে আলাদাভাবে ঘুষ দিতে হয়। ফলে কাজের প্রকৃত বাস্তবায়ন ব্যয় সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং প্রকল্পের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
হাজার কোটি টাকার টেন্ডারে কমিশনের অঙ্ক কত?
ঠিকাদারদের দাবি, রেলওয়ের বিভিন্ন প্রকৌশল দপ্তরে প্রতি অর্থবছরে প্রায় হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো উন্নয়ন কাজের টেন্ডার হয়। এসব কাজ থেকে ২–৩ শতাংশ হারে অর্থ আদায় করা হলে বছরে কয়েক কোটি থেকে কয়েক দশক কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থ সংগ্রহ হতে পারে।
তবে এই অর্থ কোথায় যায়, কারা এর হিসাব রাখেন এবং কোন খাতে ব্যয় হয়—এ বিষয়ে স্বচ্ছ কোনো তথ্য নেই বলে অভিযোগ ঠিকাদারদের।
এদিকে শাহ আলমের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান এস এ কর্পোরেশনের পক্ষে রেলওয়ের বিভিন্ন বিভাগ থেকে বিপুল অঙ্কের টেন্ডার নেওয়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার। তাদের দাবি, সংগঠনের প্রভাব এবং রাজনৈতিক পরিচয় কাজে লাগিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
ইয়াবাসহ কর্মী গ্রেপ্তার, প্রশ্নের মুখে এস এ কর্পোরেশন
এই অভিযোগের মধ্যেই শাহ আলমের প্রতিষ্ঠানের কর্মী স্টুয়ার্ড মাহবুর রহমানকে (২০) ৪ হাজার ৮৫০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তারের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত ৪ আগস্ট ঢাকাগামী কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেন থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
মাহবুর বর্তমানে কারাগারে থাকলেও তার নিয়োগকর্তা শাহ আলমের বিরুদ্ধে ওঠা টেন্ডার ও চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে একজন কর্মীর বিরুদ্ধে মাদক মামলার অভিযোগের সঙ্গে তার নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অন্যান্য অভিযোগকে সরাসরি এক করে দেখার সুযোগ নেই; বিষয়গুলো পৃথকভাবে তদন্তের দাবি রাখে।
শাহ আলমের বক্তব্য—‘চাঁদা নয়, ১ শতাংশ নেওয়া হয়’
অভিযোগের বিষয়ে এস এ কর্পোরেশনের স্বত্বাধিকারী মো. শাহ আলম বলেন, ঠিকাদারদের কাছ থেকে কোনো চাঁদা নেওয়া হয় না।
তবে তিনি টেন্ডার থেকে ১ শতাংশ অর্থ নেওয়ার কথা স্বীকার করে জানান, ওই অর্থ বাৎসরিক পিকনিক এবং ঠিকাদারদের সহযোগিতায় ব্যয় করা হয়।
আগের সময়ে হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ৫ শতাংশ হারে চাঁদা নিলেও ভয়ে কেউ কথা বলেননি—এমন দাবি করে শাহ আলম বলেন, বর্তমানে তার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অভিযোগ তোলা হচ্ছে। তবে অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
‘ফোর্স করে টাকা নেওয়া হয় না’—স্বপন
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল ঠিকাদার অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক শফিকুর রহমান স্বপন বলেন, অ্যাসোসিয়েশনের জন্য ঠিকাদাররা কিছু অর্থ দেন, তবে তা জোর করে নেওয়া হয় না।
তার দাবি, ঠিকাদারদের সহযোগিতা করা এবং সবাই যাতে সমানভাবে টেন্ডারে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান, সেটি তদারকি করার জন্যই সংগঠনটি করা হয়েছে।
টেন্ডার থেকে সংগৃহীত অর্থ কোথায় ব্যয় হয় জানতে চাইলে স্বপন বলেন, ওই অর্থ ঠিকাদারদের সহযোগিতায় ব্যয় করা হয়। তবে মোবাইলে বিস্তারিত বলতে রাজি হননি তিনি।
শাহ আলমের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে স্বপন বলেন, শাহ আলম যদি আকাম করে, তাহলে আমি তার সঙ্গে নাই। আমি রাজনীতি করি, আমার এসব আকামের দরকার নাই।
এদিকে দিনদিনই তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে। তবে রেলওয়ের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কোনো সংগঠনের নামে নির্দিষ্ট হারে অর্থ আদায়ের অভিযোগ সত্য হলে তা সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতার জন্য গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। একই সঙ্গে টেন্ডারপ্রাপ্তির পর কার্যাদেশ আটকে দেওয়া, প্রভাব খাটানো কিংবা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগগুলোও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা।
তাদের দাবি, রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন বিভাগের গত কয়েক বছরের টেন্ডার, কার্যাদেশ, ঠিকাদার নির্বাচন, সংশ্লিষ্ট সংগঠনের অর্থ সংগ্রহ ও ব্যয়ের হিসাব এবং শাহ আলমের প্রতিষ্ঠানের পাওয়া কাজগুলো স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও নথিপত্র যাচাই জরুরি।
ধারাবাহিক অনুসন্ধানের পরবর্তী পর্বে থাকছে—রেলওয়ের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক, এস এ কর্পোরেশনের কাজ পাওয়ার পদ্ধতি ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত।
