দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক মেধা বিকাশের লক্ষ্যে সরকার স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চালু করেছেন। দেশের বিভিন্ন জেলার এনজিওগুলোর সাথে এসব ফিডিং সরবরাহের চুক্তি করেন সরকার। সেই আলোকে দেশের উপকূলীয় এলাকার ৬ টি জেলার স্কুল ফিডিং কন্ট্রাক্ট পায় ভোলার গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা নামের অর্থ লগ্নিকারী একটি প্রতিষ্ঠান।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত ও বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়াতে ভোলা’সহ দেশের ছয় জেলায় স্কুল ফিডিং কার্যক্রম শুরু করেছে এ সংস্থাটি।
চলতি বছরের ২৯ মার্চ উপকূলীয় জেলা ভোলা,পটুয়াখালী,বরগুনা, পিরোজপুর,ফরিদপুর,ও গোপালগঞ্জে একযোগে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। এ কর্মসূচির আওতায় ২ হাজার ৬৭৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩ লাখ ৬১ হাজার ৭৩৫ জন শিক্ষার্থীর মাঝে ডিম, রুটি ও কলাসহ পুষ্টিকর খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।
বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা (জিজেইউএস) সূত্রে জানা যায়, স্ব’স্ব জেলায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের আয়োজনে এবং জিজেইউএস-এর বাস্তবায়নে কর্মসূচিটি পরিচালিত হচ্ছে। এতে ভোলার দৌলতখান উপজেলার ১০৬টি, বোরহানউদ্দীন উপজেলার ১৫৬টি, তজুমুদ্দীন উপজেলার ১১০টি এবং মনপুরা উপজেলার ৪৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মোট ৫২,৭২৭ জন শিক্ষার্থীর জন্য ডিম, কলা, রুটি ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।
জিজেইউএস-এর অতিরিক্ত পরিচালক ও প্রকল্প সমন্বয়কারী ডা. খলিলুর রহমান জানান, এই প্রকল্পের আওতায় ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুরের বানরি পাড়া ফরিদপুর, রাজবাড়ি ও গোপালগঞ্জ জেলার মোট ২,৬৭৩টি প্রতিষ্ঠানে ৩,৬১,৭৩৫ জন শিক্ষার্থীর মাঝে ডিম, রুটি ও কলা খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। যা আগমী ১ বছর পর্যন্ত চলবে।
এদিকে স্কুল ফিডিং কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা উপকূলীয় জেলাগুলোর স্কুলগুলোতে শিশুদের নিম্নমানের পঁচা ও বাসি নাস্তা দেয়ার একাধিক অভিযোগ উঠেছে। সে জন্য সম্প্রতি প্রাথমিক ও গন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ ঘোষনা করেন যে,যারা স্কুল ফিডিং সরবরাহে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন শুধু তারাই ফিডিং সরবরাহ করতে হবে; কোনোপ্রকার সাব কন্ট্রাক্ট দেয়া যাবেনা। এটি প্রমানিত হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার সাথে সরকার চুক্তি বাতিল করবেন। প্রতিমন্ত্রীর এমন ঘোষণার পরও গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থার টোনক নড়েনি। তারা সরকারের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে প্রতিটি জেলায় সাব কন্ট্রাক্টের মাধ্যমেই স্কুলগুলোতে অস্বাস্থ্যকর নিম্নমানের পঁচা ও বাসি নাস্তা সরবরাহ করছেন।
ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার স্কুলগুলোতে নাস্তা সরবরাহ করেন সাব কন্ট্রাক্টর শাহাবুদ্দিন বাচ্চু। এ বিষয়ে তার সাথে কথা হলে তিনি গণমাধ্যমকে জানান,গ্রামীন জন উন্নয়ন সংস্থার সাথে আমি স্থানীয় ঠিকাদার হিসেবে স্কুলে নাস্তা সরবরাহের সাব কন্ট্রাক্ট নিয়েছি। তিনি জানান,সর্বশেষ আমি গত বৃহস্পতিবার (২১ মে) স্কুলগুলোতে নাস্তা সরবরাহ করেছি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,বিগত ১৬ বছরধরে গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থাটি উপকূলীয় জেলাগুলোতে আ’লীগের অন্যতম ডোনার হিসেবে কার্যক্রম চালাতো। ফ্যাসিস্ট আ’লীগের তাবেদার হিসেবে এ সংস্থার পরিচালক জাকির হোসেন মহিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে পুরস্কার বাগিয়ে নেন। ওই সময় দলীয় ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সরকারের নিজস্ব সংস্থা পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এর পার্টনার হয়ে সরকারের শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। জুলাই বিপ্লবের পর হঠাৎ জার্সি বদল করে বিএনপি স্রোতে ঢুকে পড়েন। পূর্বের ধারাবাহিকতায় উক্ত জাকির হোসেন মহিন এবার স্কুল ফিডিং এর শত কোটি টাকার কন্ট্রাক্ট কব্জা করে বিএনপি সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মাস্টার প্ল্যান শুরু করেছেন বলে সচেতন মহল অভিযোগ তুলেছেন।
তারা মনে করেন-এভাবে চলতে থাকলে সরকারের এ উদ্যোগ শিশুদের সুস্থ বিকাশে বাঁধাগ্রস্থ হবে এবং দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বরগুনায় যা ঘটলো —-এদিকে বরগুনা জেলার তালতলী উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে স্কুল ফিডিং প্রকল্পের শিশু শিক্ষার্থীদের পঁচা ডিম ও রুটি সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থার বিরুদ্ধে। এতে শিশু শিক্ষার্থীর মধ্যে বিরুপ প্রতিক্রিয়া এবং শিক্ষায় অগ্রগতি মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা।
জানা গেছে, বরগুনার তালতলী উপজেলার ৭৯টি বিদ্যালয়ের ৭হাজার ২৭০টি শিশুকে এ প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে। বিদ্যালয় চলাকালীন প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে দৈনিক একটি ডিম, রুটি, কলা, বিস্কুট দুধ দেওয়া হবে। এর মধ্যে ডিম, কলা ও রুটি ক্রয়ের দায়িত্ব পান গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা।
গত ২৯ মার্চ ওই সংস্থা ডিম, রুটি ও কলা সরবরাহ শুরু করেন। কিন্তু শুরুতেই কাঁচা কলা,পঁচা ডিম ও রুটি সরবরাহের অভিযোগ ওঠে সংস্থাটির বিরুদ্ধে।
শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দুই দিনের রুটি একসঙ্গে বিদ্যালয়ে দিয়ে যান। মেয়াদ থাকলেও ওই রুটি পঁচা। এছাড়া কাটা ডিম সরবরাহ করলেও ওই ডিমের মধ্য থেকে অধিকাংশ ডিম পঁচা। সিদ্ধ করার সময় পঁচা ডিম ধরা না পরলেও বাচ্চারা যখন খেতে শুরু করে তখন দুর্গন্ধ বেড়িয়ে আসে। তখন এগুলো খাওয়ার উপযোগী থাকে না।
সরদারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইয়াসিন ও মারিয়া জানান, ডিম ও রুটি পঁচা। খাওয়ার উপযোগী না, তাই ফেলে দিয়েছি। তারা আরও জানান, আমরা তো ডিম, রুটি ও কলা সরকারের কাছে খেতে চাইনি। যখন দিয়েছে তা পঁচা হবে কেনো?
ছাতনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী জানান, পঁচা ডিম ও রুটি না খেয়ে ফেলে দিয়েছি।
গাবতলী রফিক মিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, সরবরাহকৃত ডিমের মধ্যে বেশ কিছু পঁচা ডিম বের হয়েছে। দুইদিন আগে রুটি দিয়ে গেলে ওই রুটি ভালো থাকে না। রুটির ওপর ফাঙ্গাশ পড়ে নষ্ট হয়ে যায়। তখন আর খাওয়ার উপযোগী থাকে না।
বিদ্যালয়ে খাবার সরবরাহকারী গ্রামীন জন উন্নয়ন সংস্থা’র সাব কন্ট্রাক্টর মো. ইউনুস মিয়া বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা আমাকে যে পণ্য সরবরাহ করতে বলেছেন আমি তা বিদ্যালয়ে পৌঁছে দিয়েছি। তবে ডিম ও রুটি পঁচার বিষয়টি আমাকেও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন।
গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থার প্রকল্প পরিচালক মো. খলিলুর রহমান বলেন, ডিম তো কেউ নিজে থেকে পেড়ে দেয়না। শুনেছি কিছু পঁচা ডিম বের হয়েছে। তবে পরবর্তী সপ্তাহ থেকে মান যাছাই করে ভালো পন্য দেওয়া হবে।
তালতলী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. আবুল বাশার বলেন, অনেক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কাঁচা কলা,পচা ডিম ও রুটির বিষয়ে আমাকে অবহিত করেছেন। আমি সকল বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের নির্দেশ দিয়েছি কোন মতেই পঁচা ডিম ও রুটি শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না।
তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে করণীয় নিয়ে প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে সভা করা হয়েছে এবং বিষয়টি প্রাথমিক ও গণ শিক্ষা অধিদপ্তরকে অবহিত করা হয়েছে।
এদিকে এসব বিষয়ে বক্তব্য নিতে গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা’র নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন মহিনের সাথে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
