বাংলাদেশের লাখো মানুষ এখনও ইউনানি চিকিৎসাকে বিশ্বাস করেন প্রাকৃতিক ও তুলনামূলক নিরাপদ চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে। জাতীয় ইউনানি ফর্মুলারি অনুযায়ী ইউনানি ওষুধের মূল ভিত্তিই হচ্ছে ঔষধি উদ্ভিদ, প্রাকৃতিক খনিজ উপাদান এবং ঐতিহ্যবাহী প্রক্রিয়াজাত উপকরণ। কিন্তু সেই আস্থার জায়গাতেই এখন দেখা দিয়েছে বড় ধরনের প্রশ্ন।
পাবনার দক্ষিণ মাসিমপুরে অবস্থিত ইউনিটেক ফার্মাসিউটিক্যালস (ইউনানি)-এর উৎপাদিত কয়েকটি বহুল বিক্রীত ইউনানি ওষুধ ঘিরে উঠেছে একের পর এক বিতর্ক ও অভিযোগ। বাজারে এসব ওষুধের অস্বাভাবিক কম মূল্যে বিক্রি, দ্রুত কার্যকারিতার দাবি এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
প্রশ্ন উঠছে—প্রাকৃতিক ইউনানি ওষুধের নামে বাজারে আসলে কী বিক্রি হচ্ছে ? অবিশ্বাস্য মূল্য বৈষম্য: ৪০০ টাকার ওষুধ ৫০ টাকায় ! উৎপাদন লাইসেন্স নম্বর ইউ-১৩৭-এর আওতায় উৎপাদিত ইউনিটেকের বেশ কয়েকটি ওষুধ বর্তমানে বাজারে লেবেলে উল্লেখিত মূল্যের তুলনায় অত্যন্ত কম দামে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী— ওষুধের নাম, লেবেল মূল্য, অভিযোগ অনুযায়ী পাইকারি মূল্য, জেবি-টন (শরবত সেব)
৩৫০ টাকা কিন্তু পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে
৪৫–৫০ টাকায়, জেবি-জিনসিন (শরবত জিনসিন) ৩৬০ টাকা কিন্তু পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৭০–৮০ টাকায়, এফ-গ্লোবিন (শরবত ফওলাদ) ৩৫০ টাকা কিন্তু পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৪০–৫০ টাকায়, বাস্টোম (শরবত বাদিয়ান) ৩৫০ টাকা কিন্তু পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে, ৪০–৫০ টাকায়, জেবিরল (শরবত এজাজ) ৮০ টাকা কিন্তু পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৮–২০ টাকায়, এবং জয়-ওরা-সি (ভিটামিন সি ট্যাবলেট) ২০০ টাকা কিন্তু পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৪০–৪৫ টাকায়।
সংশ্লিষ্ট বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে লেবেল মূল্যের মাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশ দামে এসব ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে।
খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কাজ করে—সন্দেহের সূত্রপাত এখানেই : পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, ইউনিটেকের কিছু ইউনানি ওষুধ সেবনের পর ব্যবহারকারীরা দ্রুত শক্তি বৃদ্ধি, আরাম বা তাৎক্ষণিক উপশম অনুভব করেন।
সাধারণভাবে ইউনানি চিকিৎসা ধীরগতিতে শরীরের ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কাজ করে বলে পরিচিত। ফলে তাৎক্ষণিক ফল পাওয়ার অভিযোগ থেকেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—এসব ওষুধে কি অনুমোদিত ইউনানি উপাদানের বাইরে অন্য কোনো রাসায়নিক উপাদান ব্যবহৃত হচ্ছে? যদিও এ অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি পরীক্ষাগার রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি।
জাতীয় ইউনানি ফর্মুলারি কী বলে ? বাংলাদেশ জাতীয় ইউনানি ফর্মুলারি অনুযায়ী ইউনানি ওষুধের উপাদান ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কোনো ইউনানি ওষুধে অনুমোদনহীন সিনথেটিক রাসায়নিক, স্টেরয়েড বা অ্যালোপ্যাথিক উপাদান মেশানো হয়ে থাকে, তাহলে তা নীতিমালার পরিপন্থী হওয়ার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
জনস্বাস্থ্য নিয়ে শঙ্কা : স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অনুমোদনহীন রাসায়নিক উপাদান দীর্ঘদিন গ্রহণ করলে— লিভারের ক্ষতি হতে পারে। কিডনির কার্যকারিতা ব্যাহত হতে পারে; হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে; শরীরে বিষক্রিয়া ও অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে। তবে উল্লিখিত ওষুধগুলোর ক্ষেত্রে এসব ঝুঁকি বাস্তবে বিদ্যমান কিনা, তা নিশ্চিত করতে স্বাধীন পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন : বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ভোক্তাদের প্রধান প্রশ্নগুলো হলো— এত কম দামে ওষুধ বিক্রির কারণ কী ? উৎপাদনে অনুমোদিত ফর্মুলা অনুসরণ করা হচ্ছে কি ? বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাব টেস্ট করা হয়েছে কি ? পরীক্ষার ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে কি ?
অভিযোগের মুখে নীরবতা- এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, পাবনার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং ইউনিটেক ফার্মাসিউটিক্যালস (ইউনানি)-এর মালিকপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। তবে প্রতিবেদনের জন্য যোগাযোগের সময় তাদের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে। এখন প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, ভোক্তা অধিকারকর্মী ও সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, বিষয়টি নিয়ে দ্রুত এবং নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি।
তারা দাবি করছেন— বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ;
স্বীকৃত ল্যাবরেটরিতে রাসায়নিক বিশ্লেষণ;
উৎপাদন কারখানা পরিদর্শন;
কাঁচামাল যাচাই;
পরীক্ষার ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। কারণ, দেশের অসহায়, নিম্নআয়ের, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ চিকিৎসার আশায় এসব ওষুধ ব্যবহার করে থাকেন। তাদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অনিশ্চয়তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
শেষ প্রশ্ন : ইউনানি চিকিৎসা মানুষের আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। কিন্তু যদি সেই আস্থার আড়ালে অনুমোদনহীন উপাদান, নিম্নমানের উৎপাদন বা মূল্য কারসাজির অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে তা শুধু ভোক্তা প্রতারণাই নয়—জনস্বাস্থ্যের জন্যও গুরুতর হুমকি।
এখন প্রশ্ন একটাই— ইউনানি ওষুধের বোতলের ভেতরে আসলে কী আছে ? এর উত্তর খুঁজে বের করা এখন সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দায়িত্ব। দেশের কোটি মানুষের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার স্বার্থেই সেই তদন্ত হওয়া প্রয়োজন দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে।
