বাংলাদেশের অর্থনীতির আকাশে এখন এক অদ্ভুত টানাপোড়েন—একদিকে সংস্কারের চাপ, অন্যদিকে বাস্তবতার টান। সেই দ্বৈততার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সরকার, আর সামনে কঠোর শর্ত নিয়ে অপেক্ষায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল।
রাজস্ব ও আর্থিক খাতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না থাকায় ঋণ কর্মসূচির গতি ইতোমধ্যেই মন্থর হয়ে পড়েছে। এপ্রিলের নির্ধারিত মিশন পিছিয়ে জুলাইয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত যেন সেই স্থবিরতারই প্রতিচ্ছবি। গত মার্চে কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন ঢাকা সফরে এসে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন—সংস্কার না এগোলে অর্থ ছাড়ের পথও হবে কণ্টকাকীর্ণ। ফলে জুনের আগেই দুই কিস্তিতে ১৩০ কোটি ডলার পাওয়ার আশা তখনই অনিশ্চয়তার ছায়ায় ঢেকে যায়।
ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বসন্তকালীন বৈঠকে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল আইএমএফ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক দফায় আলোচনা করলেও শর্তের তালিকা হয়েছে আরও কঠিন, আরও স্পষ্ট। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ছাড়া ভর্তুকি প্রত্যাহার, করছাড় বাতিল, একক ভ্যাট হার—এসব যেন অর্থনীতির বুকে চাপানো এক ভারী বাস্তবতা।
কিন্তু নতুন সরকার সব শর্তে সায় দিচ্ছে না। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির নরম আবেগ আর বাস্তব রাজনীতির হিসাব মেলাতে গিয়ে তারা এখন সতর্ক পদক্ষেপ নিচ্ছে। কারণ, ভর্তুকি কমালে যেমন জনজীবনে চাপ বাড়বে, তেমনি ১৫ শতাংশ একক ভ্যাট চালু হলে মূল্যস্ফীতির আগুন আরও দাউ দাউ করে জ্বলে উঠতে পারে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অবশ্য দাবি করেছেন—জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সঙ্গে আইএমএফের শর্তের সরাসরি সম্পর্ক নেই। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে ভিন্ন কথা—আইএমএফের অর্থ ছাড় নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব। কারণ, এই সংস্থার সিগন্যাল না পেলে অন্যান্য দাতারাও মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে।
২০২৩ সালের চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি ছিল বাংলাদেশের। এখন সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নেই চাপ দিচ্ছে আইএমএফ—যা আগামী বাজেটের ওপরও ফেলছে গভীর ছায়া।
রাজস্ব খাতে অচলাবস্থা- কর আহরণে লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি আইএমএফকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। প্রতি বছর জিডিপির অন্তত ০.৫ শতাংশ হারে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের শর্ত এখনও পূরণ হয়নি।
সংস্কারের অংশ হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ভেঙে আলাদা দুটি বিভাগ গঠনের প্রস্তাব এলেও বাস্তবে তা থমকে আছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলন, প্রশাসনিক অনীহা—সব মিলিয়ে এই উদ্যোগ এখন কাগজেই বন্দি।
ব্যাংক খাতেও থমথমে অগ্রগতি- ব্যাংকিং খাতেও সংস্কারের গতি সন্তোষজনক নয় বলে মনে করছে আইএমএফ। খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা পরিবর্তন, পরিচালকদের কাঠামো নির্ধারণ কিংবা ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন—সবই যেন ধীরগতির ফাইলবন্দি বাস্তবতা।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমানোর লক্ষ্যও পূরণ হয়নি। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংক-এর স্বায়ত্তশাসন জোরদারের জন্য প্রস্তাবিত আইন সংশোধনও এখনও আলোর মুখ দেখেনি। নতুন আইনগুলোতে পুরোনো মালিকদের ফিরে আসার সুযোগ নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে আইএমএফ।
বাজেট নিয়ে বাড়ছে দ্বন্দ্ব-
রাজস্ব আয় কাঙ্ক্ষিত না হলেও সরকার প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বড় বাজেট প্রণয়নের পথে হাঁটছে। যা আগের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। সীমিত আর্থিক সক্ষমতার বিপরীতে এই ব্যয় পরিকল্পনাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলেই দেখছে আইএমএফ।
সব মিলিয়ে, অর্থনীতির মঞ্চে এখন এক সূক্ষ্ম নাটক চলছে—একদিকে আন্তর্জাতিক শর্তের কঠিন চাপ, অন্যদিকে জনজীবনের নরম স্পর্শ। এই টানাপোড়েনের গল্পে সিদ্ধান্ত যেদিকেই যাক, তার প্রতিধ্বনি পৌঁছাবে প্রতিটি মানুষের জীবনে।
