চট্টগ্রামের বাতাসে এখন এক অদ্ভুত গল্প ভাসছে—যেন ক্ষমতা আর প্রভাবের অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা এক প্রতিষ্ঠান, যেখানে নিয়মের চেয়ে সম্পর্ক শক্তিশালী, আর নীতির চেয়ে প্রভাব বেশি কার্যকর। রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ভেতরে চলমান এই নাটকীয়তার কেন্দ্রে রয়েছেন এক বরখাস্ত সিবিএ নেতা—আর তাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে প্রভাব, অনিয়ম আর নেপথ্য লবিংয়ের এক গভীর উপাখ্যান।
সরকারি ছুটির নীরব সন্ধ্যায়, যখন শহর ধীরে ধীরে বিশ্রামে ডুবে যাচ্ছিল, তখনই যমুনা অয়েলের অফিসে যেন জেগে উঠেছিল অন্য এক গল্প। নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউসুফ হোসেন ভুইয়া—যিনি অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত—তার সঙ্গে দেখা করতে হঠাৎ হাজির হন সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা আজম নাসিরের বড় ভাই একেএম সাইফ উদ্দিন আহমেদ। সঙ্গে ছিলেন প্রতিষ্ঠানের আলোচিত কর্মকর্তা মাসুদুল ইসলাম।
এই সাক্ষাৎ যেন ছিল নিছক সৌজন্য নয়—বরং এক চাপা অনুরোধ, এক অঘোষিত দাবি—বরখাস্ত সিবিএ নেতা মুহাম্মদ এয়াকুবকে আবার ফিরিয়ে আনার জোর চেষ্টা। তবে এটা শুধু অনুরোধ না,এক ধরনের শীতল চাপ।
বরখাস্তের গল্পে লুকানো অজানা প্রশ্নে জর্জরিত যমুনা অয়েল। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি, তিনজন সিবিএ নেতাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। কাগজে-কলমে এটি ছিল নিয়মতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত, কিন্তু এর ভেতরেই যেন লুকিয়ে ছিল অসংখ্য প্রশ্নের ছায়া।
আবার কেন নিয়ম ভেঙে জুনিয়র কর্মকর্তার স্বাক্ষরে জারি হলো বরখাস্তপত্র? কেন গ্রেফতারের পরদিন থেকেই ছুটি মঞ্জুর হলো? এটা যেন সবকিছুই সাজানো এক নীরব নাটক—যেখানে কাগজের ভাষা এক, কিন্তু বাস্তবের গল্প আরেক।
অভিযোগ উঠেছে, বিতর্কিত কর্মকর্তা মাসুদুল ইসলাম নিজেই এই পুরো প্রক্রিয়ার নেপথ্যে ছিলেন। ছুটির আবেদন থেকে অনুমোদন—সবকিছুতেই তার অদৃশ্য ছোঁয়া।
এক সাধারণ কর্মচারী থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু।
মুহাম্মদ এয়াকুব—নামটি যেন যমুনা অয়েলের করিডোরে এক রহস্যময় প্রতিধ্বনি। ১৯৯৪ সালে অস্থায়ী কর্মচারী হিসেবে যাত্রা শুরু, আর আজ—অভিযোগ অনুযায়ী—শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক।
তার জীবনের গল্প যেন এক অদ্ভুত রূপকথা—কিন্তু এই রূপকথার ভেতরে লুকিয়ে আছে অভিযোগ, প্রশ্ন আর বিতর্কের দীর্ঘ ছায়া। অভিযোগের উল্লেখ্যযোগ্য বিষয়গুলোর মধ্যে-
* নিয়োগে প্রভাব ও কমিশন বাণিজ্য
* আত্মীয়স্বজনদের চাকরির জাল
* তেল চুরির সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ
* চাকরি দেয়ার নামে অর্থ আত্মসাৎ
* ওয়েলফেয়ার ফান্ডের অর্থ নিয়ে অনিয়ম
প্রতিষ্ঠানের ভেতরে তার প্রভাব এতটাই বিস্তৃত ছিল যে, অনেকের ভাষায়—“তার কথাই ছিল অলিখিত আইন”।
তদন্তের আলো, নাকি অন্ধকারের আড়াল?
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একাধিকবার তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। ২০১৪ সালে, আবার ২০২৪ সালে—দুটি তদন্তই রহস্যজনকভাবে থেমে গেছে মাঝপথে।
এ যেন আলো জ্বালানোর চেষ্টা, কিন্তু প্রতিবারই কেউ না কেউ সেই আলো নিভিয়ে দেয়।
এদিকে ২০২৬ সালেও নতুন করে নথি চাওয়া হয়েছে—তবু প্রশ্ন রয়ে যায়,এই তদন্ত কি সত্যিই শেষ পর্যন্ত পৌঁছাবে, নাকি আবারও হারিয়ে যাবে ফাইলের স্তূপে?
মুক্তির পর ফিরে আসা প্রভাব খাটানোর ছায়া-
জেল থেকে জামিনে মুক্তির পর, এয়াকুব যেন আবার ফিরে পেয়েছেন তার পুরোনো ছন্দ। বরখাস্তাদেশ প্রত্যাহারের জন্য তার তৎপরতা এখন তুঙ্গে। অভিযোগ—এই তৎপরতার পেছনে রয়েছে প্রভাবশালী মহলের নীরব সমর্থন। যেন এক দীর্ঘ বিরতির পর আবার শুরু হয়েছে পুরোনো গল্পের নতুন অধ্যায়।
প্রশ্নের মুখে প্রতিষ্ঠান, নাকি পুরো ব্যবস্থা?
যমুনা অয়েল কি শুধুই একটি প্রতিষ্ঠান?নাকি এটি হয়ে উঠেছে ক্ষমতা আর প্রভাবের এক পরীক্ষাগার—যেখানে নিয়ম ভাঙে, আবার নতুন নিয়ম তৈরি হয়?
একজন সিবিএ নেতার প্রভাব যদি পুরো প্রতিষ্ঠানের ওপর এতটা বিস্তৃত হয়,তবে জবাবদিহিতা কোথায়? আবার নৈতিকতা কোথায়? এমন প্রশ্নেরই উত্তর মিলছে না।
উল্লেখ্য যে —গল্পের পরিণতি কোথায়?
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ যেন এক অসমাপ্ত উপন্যাস—যেখানে প্রতিটি চরিত্র শক্তিশালী, প্রতিটি দৃশ্য রহস্যময়, আর প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর রয়েছে অধরা। সত্য কি শেষ পর্যন্ত আলোয় আসবে?নাকি আবারও সবকিছু চাপা পড়ে যাবে অন্ধকারের স্তরে?
সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি যমুনা অয়েলের এই গল্প এখন শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়—এটি হয়ে উঠেছে ক্ষমতা, প্রভাব আর বাস্তবতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। এ রহস্যের আদৌ কি সমাধান সম্ভব নাকি অন্ধকারে রয়ে যাবে? এমন প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছে নেটিজেনরা।
