চট্টগ্রামের আকাশে যেন হালকা ধোঁয়া—কিন্তু এই ধোঁয়া আগুনের নয়, অভিযোগের। আর সেই আগুনের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আনোয়ার হোসেন। তার বিরুদ্ধে ওঠা একের পর এক অনিয়ম, দুর্নীতি আর ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ যেন এক রহস্যময় নাটকের পর্দা উন্মোচন করছে, যেখানে প্রতিটি দৃশ্যেই লুকিয়ে আছে বিস্ময় আর বিতর্ক।
২৬ এপ্রিল ২০২৬—একটি তারিখ, যেদিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দরজায় কড়া নাড়ে একটি লিখিত অভিযোগপত্র। সেখানে তুলে ধরা হয় এমন এক চিত্র, যেখানে সরকারি ক্রয় কার্যক্রম যেন নিয়মের পথ হারিয়ে ফেলেছে। বাজারের সাধারণ টেবিল-চেয়ার যেন হঠাৎ করেই হয়ে উঠেছে বিলাসবহুল দ্রব্য—দামে দ্বিগুণ, আর সেই অতিরিক্ত অর্থ কোথায় মিলিয়ে যাচ্ছে, তার উত্তর খুঁজছে অভিযোগকারী।
অভিযোগের ভাষায়, কোটেশন যেন শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ—বাস্তবে সরবরাহ এসেছে অন্য পথ দিয়ে, অন্য কোনো অদৃশ্য হাতের ইশারায়। এমনকি উচ্চমানের পণ্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েও নিম্নমানের সরঞ্জাম গ্রহণের অভিযোগ যেন পুরো ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
কিন্তু গল্প এখানেই থেমে নেই—একটি ১৬ তলা ভবনের অগ্নি নিরাপত্তা ছাড়পত্রের মতো গুরুতর বিষয়েও নিয়ম ভাঙার অভিযোগ। কমিটি গঠনে নিজের পছন্দমতো মানুষ বসিয়ে যেন ক্ষমতার এক নীরব খেলা চালিয়েছেন তিনি—এমনটাই দাবি অভিযোগকারীর।
আরও বিস্ময় জাগায় অফিসের জন্য সরবরাহকৃত মসুর ডালের গল্প—যেখানে মানের চেয়ে প্রভাবই নাকি ছিল বড়। আপত্তি থাকা সত্ত্বেও স্বাক্ষর আদায়ের চাপ—এই দৃশ্য যেন অফিসের দেয়ালেও অস্বস্তির ছাপ রেখে গেছে।
ব্যক্তিগত জীবনের এক আবেগঘন মুহূর্ত—মেয়ের বিয়ে—সেখানেও অভিযোগের ছায়া। সহকর্মীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ, উপহারের নামে সোনার গহনা—সব মিলিয়ে যেন দায়িত্ব আর ব্যক্তিস্বার্থের সীমারেখা মুছে গেছে কোথাও।
সরকারি গাড়ির চাকা ঘুরেছে—কিন্তু সব পথ কি সরকারি ছিল? অভিযোগ বলছে, ব্যক্তিগত প্রয়োজনে সেই গাড়ির দীর্ঘ সফর, জ্বালানির অপচয়—যেন ক্ষমতার এক নীরব অপব্যবহার।
অভিযোগ আরও গভীরে গিয়ে ছুঁয়েছে সম্পদের প্রশ্ন—মাইক্রোবাস কেনা, জমি ক্রয়, বাড়ি নির্মাণ—সবকিছুর উৎস নিয়েই উঠেছে সন্দেহের কালো মেঘ।
এরই মাঝে একটি শূন্য পদ—উপ-পরিচালক নেই দীর্ঘদিন। আর সেই শূন্যতার ফাঁক গলে যেন ক্ষমতার একক আধিপত্য গড়ে ওঠার অভিযোগ। নিজেকে “ভারপ্রাপ্ত” হিসেবে উপস্থাপন, অফিসের চেয়ার-সিল ব্যবহার—সব মিলিয়ে যেন এক অঘোষিত ক্ষমতার আসন।
অধীনস্থদের সঙ্গে আচরণ নিয়েও অভিযোগ কম নয়—অসৌজন্য, গালিগালাজ, এমনকি শারীরিক নির্যাতনের মতো গুরুতর অভিযোগও উঠে এসেছে।
এই পুরো ঘটনার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে অভিযোগকারী মোহাম্মদ ইমরান হোসেন দাবি করেছেন—একটি নিরপেক্ষ তদন্ত হোক, সত্য বেরিয়ে আসুক, আর প্রয়োজনে নেওয়া হোক কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা।
তবে অভিযুক্ত আনোয়ার হোসেন সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এসবের কোনো ভিত্তি নেই। মাঠে এসে দেখেন—কে কোথা থেকে অভিযোগ করছে আমি তাকে চিনি না। আমার কাজকে বাধাগ্রস্ত করতেই এসব করা হচ্ছে।
চট্টগ্রামের বাতাসে এখন প্রশ্ন—এ কি শুধুই অভিযোগের গল্প, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও গভীর সত্য? সময়ই হয়তো দেবে তার উত্তর।
