দুই দপ্তরের নিয়ন্ত্রণ, কোটি টাকার ঠিকাদারি আর প্রভাবের রাজনীতি—সহকারী পরিচালক কবির উদ্দীনের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক সব অভিযোগ। ছবি সংগৃহীত
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এক নন-ক্যাডার কর্মকর্তা কীভাবে বছরের পর বছর ধরে একাধিক দপ্তরে প্রভাব বিস্তার করে কোটি কোটি টাকার টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করছেন—এমন বিস্ময়কর ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে সহকারী পরিচালক (গোট ফার্মস) ডা. মো. কবির উদ্দীনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতার ছত্রছায়ায় তিনি গড়ে তুলেছেন এক অপ্রতিরোধ্য বলয়, যেখানে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কার্যত জিম্মি।
ইতোপূর্বে বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া না দিয়ে বরং আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি প্রতিবেদকের সঙ্গে হুমকিমূলক ভাষায় কথাও বলেছেন বলে জানা গেছে। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্রচলিত প্রবাদ আছে—“চোরের মায়ের বড় গলা”; সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ডা. কবির উদ্দীনের আচরণ যেন সেই প্রবাদকেই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। একদিকে দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ, অন্যদিকে সাংবাদিকদের ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে তার প্রভাবের উৎস কোথায়?
এক কর্মকর্তা, দুই দপ্তর—নিয়ম কি শুধু কাগজেই?
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ জেলা ভেটেরিনারি হাসপাতালে কর্মরত থাকলেও একইসঙ্গে অধিদপ্তরের উৎপাদন শাখার সহকারী পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন ডা. কবির উদ্দীন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দীর্ঘদিন একই এলাকায় অবস্থান এবং একইসঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন সরকারি নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অভিযোগ রয়েছে, প্রায় দেড় দশক ধরে একই এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে তিনি এমন একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন, যার কারণে প্রশাসনের অনেকেই তার বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পান না।
সরকারি চাকরির আড়ালে ‘ঠিকাদারি সাম্রাজ্য’
অভিযোগের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো—সরকারি চাকরিতে থেকেই নিজস্ব প্রতিষ্ঠান মেসার্স এস কে ট্রেডার্স-এর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পের কোটি কোটি টাকার কার্যাদেশ বাগিয়ে নেওয়া। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্প পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে নিয়মিতভাবে এসব কাজ নেওয়া হচ্ছে।
এমনও অভিযোগ রয়েছে, গভীর রাত পর্যন্ত অফিস খোলা রেখে সেখান থেকেই টেন্ডার ও ঠিকাদারি সংক্রান্ত নানা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। বিষয়টি নিয়ে অধিদপ্তরের ভেতরেও তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে বলে জানা গেছে।
টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী সিন্ডিকেট-
একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জে দীর্ঘদিন কর্মরত থাকার সুযোগে ডা. কবির গড়ে তুলেছেন একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যারা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিভিন্ন টেন্ডার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, যে টেন্ডারেই লাভ, সেখানে কবির সিন্ডিকেটের প্রভাব—এটাই এখন ওপেন সিক্রেট।
দিবসের নামে চাঁদাবাজি?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক অনুষ্ঠান ও দিবস উদযাপনের নামে প্রকল্প ও দপ্তর থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলা হয়। সর্বশেষ বিশ্ব ভেটেরিনারি দিবস উপলক্ষে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে প্রায় ৫০ লাখ টাকা সংগ্রহের অভিযোগও উঠেছে।
যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ মুখ খুলতে রাজি হননি, তবে ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ বাড়ছে বলেই দাবি সংশ্লিষ্টদের।
সরকারি ওষুধ কোথায় যাচ্ছে?
নারায়ণগঞ্জ জেলা ভেটেরিনারি হাসপাতালের জন্য বরাদ্দকৃত ওষুধ ও ভিটামিন খামারিদের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণের কথা থাকলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। খামারিদের দাবি, অনেক ওষুধ গোপনে বিক্রি কিংবা ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তাদের ভাষ্য, বিতরণ তালিকা ও প্রকৃত সুবিধাভোগীদের তথ্য যাচাই করলেই বেরিয়ে আসবে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।
৯ম গ্রেডের চাকরি, অথচ অঢেল সম্পদের মালিক!
একজন ৯ম গ্রেডের নন-ক্যাডার কর্মকর্তা হয়েও ঢাকায় বাড়ি, নারায়ণগঞ্জে জমিসহ বিপুল সম্পদের মালিকানা কীভাবে অর্জন করলেন—তা নিয়েও উঠেছে বড় প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিনের টেন্ডার বাণিজ্য, অনিয়ম ও প্রভাব খাটিয়েই গড়ে উঠেছে এই সম্পদের পাহাড়।
রাজনৈতিক রঙ বদলে টিকে থাকার কৌশল?
অভিযোগ রয়েছে, সময় ও পরিস্থিতি বুঝে রাজনৈতিক পরিচয় বদলে নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করাই ডা. কবির উদ্দীনের অন্যতম কৌশল। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক বলয়ে নিজের অবস্থান শক্ত রাখতেই তিনি এই কৌশল অবলম্বন করেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
নীরব প্রশাসন, বাড়ছে প্রশ্ন-
এতসব গুরুতর অভিযোগের পরও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের রহস্যজনক নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের দাবি, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন ও দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সেবাব্যবস্থা আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ডা. কবির উদ্দীনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
