প্রতীকী ছবি
পল্লবীতে যেন একের পর এক উন্মোচিত হচ্ছে নিঃসঙ্গ জীবনের নির্মম পরিণতি। কয়েকদিন আগেই এক বৃদ্ধা নারীর গলিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় যখন দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে, ঠিক তখনই একই এলাকায় আরেক নারীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
মৃত ওই নারীর নাম সেলিনা আফরোজ (৫৫)। স্বামী ও দুই সন্তান কানাডায় থাকলেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর পল্লবীর একটি ফ্ল্যাটে একাই বসবাস করছিলেন। প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, কয়েকদিন আগে বার্ধক্যজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করতে হবে।
নিঃশব্দ মৃত্যু, টের পেল না কেউ-
পল্লবী থানার সেকশন-৬ এলাকার ব্লক-সি, রোড-১০-এর ১৪ নম্বর বাসার একটি ফ্ল্যাট থেকে বুধবার সকালে সেলিনা আফরোজের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রতিবেশীদের চোখের সামনে দিনের পর দিন কাটলেও তার মৃত্যুর খবর পৌঁছায়নি কারও কাছে।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্র জানায়, গত ২৬ মে রাত আনুমানিক ১১টার দিকে ভাতিজা আশফাকুর রহমানের সঙ্গে সর্বশেষ মোবাইল ফোনে কথা বলেন সেলিনা আফরোজ। এরপর থেকে তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, ২৬ মে থেকে ৩ জুনের মধ্যে কোনো এক সময়ে তিনি মারা যান। মৃত্যুর পর কয়েকদিন কেটে গেলেও কেউ তার খোঁজ নিতে আসেননি— এমন বাস্তবতা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে নগর জীবনের মানবিক সম্পর্ক নিয়ে।
কানাডা থেকে পল্লবীর একাকী জীবন
সেলিনা আফরোজ ছিলেন মৃত খলিলুর রহমান ও আফিয়া রহমানের মেয়ে। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ফ্ল্যাটটিতেই প্রায় এক যুগ ধরে একা বসবাস করছিলেন তিনি।
পুলিশ জানায়, স্বামী মোবিনুল হক ও দুই সন্তান বর্তমানে কানাডায় বসবাস করছেন। একসময় সেলিনাও পরিবারের সঙ্গে কানাডায় ছিলেন। তবে পারিবারিক বিরোধের কারণে প্রায় ১২ বছর আগে দেশে ফিরে এসে পল্লবীর ওই ফ্ল্যাটে একাকী জীবন বেছে নেন।
প্রশ্নের মুখে নগর জীবনের সম্পর্ক
মাত্র কয়েকদিন আগেই পল্লবীর আরেক বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল এক নারীর গলিত মরদেহ। সেই ঘটনায়ও উঠে আসে অবাক করা তথ্য— চার সন্তানের মধ্যে একজন যুগ্মসচিব, একজন বুয়েটের শিক্ষক, একজন কানাডাপ্রবাসী। অথচ মায়ের মৃত্যুর কয়েকদিন পরও বিষয়টি বুঝতে পারেননি পরিবারের সদস্যরা।
একই এলাকায় অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই নারীর এমন নিঃসঙ্গ মৃত্যু শুধু একটি পুলিশি ঘটনা নয়; এটি নগর জীবনের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, পারিবারিক দূরত্ব এবং বয়স্ক মানুষদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
যা বলছে পুলিশ
পল্লবী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. হানিফ জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করেছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে। এ ঘটনায় থানায় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তবে এরই মধ্যে একটি প্রশ্ন সমাজের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে— ব্যস্ত নগর জীবনে মানুষ কি ধীরে ধীরে এতটাই একা হয়ে যাচ্ছে যে মৃত্যুর পরও দিনের পর দিন তার খোঁজ রাখার কেউ থাকে না?
