জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর ধরে ঘুষ বাণিজ্য, কর ফাঁকিতে সহযোগিতা, অনিয়ম এবং নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ ঘুরপাক খেলেও সেসব অভিযোগের কার্যকর তদন্ত কেন দৃশ্যমান হয়নি—সেই প্রশ্ন এখন রাজস্ব প্রশাসনের ভেতর-বাইরে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোতে অভিযোগ জমা পড়লেও সেগুলোর অগ্রগতি নিয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য না থাকায় রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অভিযোগ আছে, নথি আছে, আলোচনা আছে—কিন্তু দৃশ্যমান তদন্ত কোথায়?
ক্ষমতার ছায়ায় চাপা পড়েছিল অভিযোগ?
অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গোপালগঞ্জের বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। চাকরিকালে তার বিরুদ্ধে অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ, ঘুষ গ্রহণ, কর ফাঁকিতে সহায়তা এবং অবৈধ পণ্য ছাড়করণে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ একাধিকবার উঠেছে।
তবে এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতাসীন বলয়ের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো গুরুত্ব পায়নি। যদিও এ দাবির পক্ষে কোনো সরকারি নথি প্রকাশ্যে আসেনি।
তাদের প্রশ্ন—যদি অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন হয়ে থাকে, তাহলে সেগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খারিজ করা হলো না কেন?
বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্বকাল নিয়ে বিতর্ক
অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে আবুল কালাম আজাদ বিপুল আর্থিক সুবিধা অর্জন করেন। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন, আমদানি-রপ্তানিসংশ্লিষ্ট কিছু ব্যবসায়ীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, ভ্যাট ও শুল্ক সংক্রান্ত অনিয়মে জড়িত কিছু প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিয়ে সরকারি রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে এখনো কোনো প্রকাশ্য সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।
কাস্টমসসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, সন্দেহজনক বা আটকে দেওয়া কিছু পণ্যের চালান পরবর্তীতে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ছাড় করে দেওয়ার অভিযোগও ছিল। প্রশ্ন উঠেছে—এসব অভিযোগের পেছনে আদৌ কোনো সত্যতা রয়েছে কি না, তা কি কখনো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হয়েছে?
সম্পদের বিস্তার নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্য
গোপালগঞ্জে স্থানীয় পর্যায়ে অনুসন্ধান চালিয়ে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে আবুল কালাম আজাদের পরিবারের নামে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি ও সম্পদ অর্জনের বিষয়টি এলাকাজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিজের নামে কম হলেও স্ত্রী, বাবা ও ঘনিষ্ঠ স্বজনদের নামে বেশি সম্পদ ক্রয় করা হয়েছে। এতে প্রকৃত মালিকানা আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে তাদের ধারণা।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, কয়েক বছরের ব্যবধানে পরিবারের সম্পদ অনেক বেড়েছে। বিভিন্ন জায়গায় জমি কেনা হয়েছে। কিন্তু এসব অর্থের উৎস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কোনো ধারণা নেই।
আরেকজনের ভাষ্য, অনেকেই আত্মীয়-স্বজনের নামে সম্পদ রাখে। আজাদের ক্ষেত্রেও এমন অভিযোগ বহুদিনের। তদন্ত হলে আসল তথ্য বেরিয়ে আসবে।
গোপালগঞ্জ থেকে শরীয়তপুর: কত সম্পদের মালিক পরিবার?
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গোপালগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমি, বসতভিটা ও বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জমি কেনার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে শরীয়তপুর জেলাতেও তার পরিবারের নামে সম্পদ থাকার তথ্য স্থানীয়ভাবে প্রচলিত।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সম্পদের বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকারও বেশি হতে পারে। তবে এসব তথ্যের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ যাচাই এখনো হয়নি।
প্রশ্ন উঠছে—একজন সরকারি কর্মকর্তার ঘোষিত আয়ের সঙ্গে এসব সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি?
জীবনযাত্রার পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, চাকরিজীবনের শুরুতে আবুল কালাম আজাদের আর্থিক অবস্থা ছিল সীমিত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তার জীবনযাত্রা, সম্পদ ও ব্যয়ের ধরনে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর মগবাজারে একটি অভিজাত ভবনের ফ্ল্যাটে তিনি বসবাস করেন। এছাড়া রাজধানীর অন্য একটি এলাকায় পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকটি আবাসনের তথ্যও পাওয়া গেছে। তবে এসব সম্পদের মালিকানা ও অর্থের উৎস সম্পর্কে সরকারি নথি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগ, নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা?
সুশাসনবিষয়ক বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী বলা যায় না। কিন্তু একই ধরনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহল থেকে উঠে এলে তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।
তাদের মতে, তদন্তে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সম্মান ও আস্থার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। আবার অভিযোগ সত্য হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
দুদকের নীরবতা বাড়াচ্ছে প্রশ্ন
অভিযোগকারীদের দাবি, অতীতে একাধিক লিখিত অভিযোগ দুদকে জমা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেসব অভিযোগের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—
অভিযোগগুলো কি তদন্তাধীন?
তদন্ত শুরু হয়েছিল কি না?
হয়ে থাকলে তার অগ্রগতি কোথায়?
আর যদি তদন্তই না হয়ে থাকে, তাহলে কেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অজানা।
স্বচ্ছতা নিশ্চিতের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহলের –
রাজস্ব প্রশাসনের সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা মনে করেন, কাস্টমস ও কর প্রশাসন এমন একটি খাত যেখানে বিপুল অঙ্কের অর্থের লেনদেন হয়। ফলে এই খাতে কর্মরত কর্মকর্তাদের সম্পদের উৎস, ব্যাংক হিসাব, আয়কর নথি এবং চাকরিকালীন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়মিত পর্যালোচনার আওতায় আনা প্রয়োজন।
দুর্নীতিবিরোধী কর্মীদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, ভূমি রেকর্ড বিশ্লেষণ এবং আর্থিক লেনদেন যাচাইয়ের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা দ্রুত নির্ধারণ করা সম্ভব।
অভিযোগ অস্বীকার আজাদের
অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে আবুল কালাম আজাদ সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে প্রচারিত অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। তিনি দাবি করেন, চাকরিজীবনে নিয়ম মেনেই দায়িত্ব পালন করেছেন এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও সঠিক নয়।
এনবিআরের গণমাধ্যম শাখার এক কর্মকর্তা জানান, অভিযোগের বিষয়টি খোঁজ নিয়ে পরে বিস্তারিত জানানো হবে। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শেষ প্রশ্ন : তদন্ত হবে, নাকি অভিযোগই থেকে যাবে?
আবুল কালাম আজাদকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ সত্য না মিথ্যা—তার চূড়ান্ত উত্তর দিতে পারে কেবল একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত। কিন্তু অভিযোগের পর অভিযোগ জমা হলেও যদি তদন্তের অগ্রগতি অদৃশ্য থাকে, তাহলে জনমনে সন্দেহ ও প্রশ্ন আরও বাড়বে।
কারণ রাষ্ট্রের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং জনগণের আস্থার সঙ্গেও সরাসরি জড়িত। তাই অভিযোগের সত্যতা উদঘাটন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এখন শুধু একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, বরং জনস্বার্থেরও দাবি।
