পদ্মা নদীতে পড়ে যাওয়া বাসটি উদ্ধার। ছবি: সংগৃহীত
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ৭ নম্বর ফেরিঘাটে শুক্রবার সকালটা শুরু হয়েছিল অন্য দিনের মতোই। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের এক বিভীষিকাময় ঘটনায় মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো ঘাট এলাকায়। ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি যাত্রীবাহী বাস সোজা ছুটে গিয়ে ফেরির র্যাম ভেঙে পদ্মার গভীর জলে তলিয়ে যায়।
সকাল প্রায় ৯টার দিকে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী এসবি সুপার ডিলাক্স বাসটি দৌলতদিয়া ৭ নম্বর ঘাটে পৌঁছায়। বাসটিতে টিকিটধারী ৪০ জনের মধ্যে ৩৭ জন যাত্রী ছিলেন। তবে প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী ফেরিতে ওঠার আগেই যাত্রীদের বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। আর সেই সিদ্ধান্তই যেন হয়ে ওঠে ৩৭টি জীবনের রক্ষাকবচ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাসটি ফেরিতে ওঠার জন্য এগিয়ে আসছিল। হঠাৎ করেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সেটি প্রচণ্ড গতিতে ফেরির ডালার দিকে ধেয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে বিকট শব্দে ডালার তার ছিঁড়ে যায় এবং বিশাল বাসটি সোজা পদ্মার কালো জলে তলিয়ে যেতে শুরু করে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত মানুষের চোখের সামনে যেন এক বিভীষিকাময় দৃশ্যের জন্ম হয়।
বাসের সহকারী সাকিব হোসেন বিপদের আভাস পেয়ে শেষ মুহূর্তে লাফিয়ে ফেরির পন্টুনে পড়ে প্রাণে বেঁচে যান। তবে চালক ঝন্টু আলী বাসসহ নদীতে পড়ে যান। কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হয়েছিল, হয়তো আর ফিরে আসবেন না। কিন্তু মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার এক অবিশ্বাস্য লড়াইয়ে তিনি বাসের জানালা ভেঙে বের হয়ে সাঁতরে ওপরে উঠতে সক্ষম হন। পরে স্থানীয়রা নৌকার সাহায্যে তাকে উদ্ধার করে তীরে নিয়ে আসেন।
দুর্ঘটনার পর পদ্মার বুকজুড়ে শুরু হয় উৎকণ্ঠা। নদীর পানির নিচে ডুবে থাকা বাসটি উদ্ধারে দ্রুত অভিযান শুরু করে উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’। কয়েক ঘণ্টার চেষ্টার পর শুক্রবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে নদীগর্ভ থেকে বাসটিকে সফলভাবে তুলে আনা হয়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শুভ সেন বলেন, “আমি পন্টুনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। দেখলাম বাসটি ফেরিতে উঠছে। যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর হঠাৎ বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডালায় আঘাত করে এবং চোখের পলকে নদীতে তলিয়ে যায়। এমন দৃশ্য জীবনে কখনও দেখিনি।”
বাসটির সুপারভাইজার আজমল হোসেন জানান, “আল্লাহর অশেষ রহমতে সব যাত্রী আগে নেমে গিয়েছিলেন। না হলে আজ বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারত।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন চালক ঝন্টু আলী বলেন, “রওনা হওয়ার আগে বাসের ব্রেক ও ইঞ্জিন পরীক্ষা করা হয়েছিল। কীভাবে নিয়ন্ত্রণ হারালাম বুঝতে পারিনি। বাসটি ডুবে যাওয়ার সময় জানালা দিয়ে বের হয়ে প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হই।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন। তিনি বলেন, “যাত্রীদের আগেই নামিয়ে দেওয়ার কারণে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। এটি সবার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। ফেরিতে ওঠা-নামার সময় অবশ্যই যাত্রীদের বাস থেকে নেমে যেতে হবে।
একটি সিদ্ধান্ত, কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধান এবং সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপা—সব মিলিয়ে পদ্মার বুকে এদিন অল্পের জন্য এড়ানো গেল এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। নদীর অতল গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া বাসটি উদ্ধার হলেও সেই কয়েক মিনিটের আতঙ্ক ও মৃত্যুভয় উপস্থিত মানুষের মনে দীর্ঘদিন দাগ কেটে থাকবে।
