আব্দুল গাফফারের বাড়ির ভাঙা কাচ। ছবি: সংগৃহীত
নোয়াখালীর হাতিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে একটি বিস্ফোরক অভিযোগকে কেন্দ্র করে। আওয়ামী লীগের সাবেক প্রভাবশালী নেতা একরামুল করিম চৌধুরীকে দেশ ছাড়তে সহায়তার বিনিময়ে তিন কোটি টাকা দাবির অভিযোগ সামনে আসার পর এবার হামলার শিকার হয়েছেন অভিযোগ উত্থাপনকারী ছাত্রদল নেতা আব্দুল গাফফার। ঘটনাকে ঘিরে মুখোমুখি অবস্থানে বিএনপি-ছাত্রদল ও এনসিপি।
অভিযোগ ফাঁস, এরপরই হামলা
ভুক্তভোগী আব্দুল গাফফার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। তাঁর দাবি, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদের বিরুদ্ধে একটি সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করার জেরেই তাঁর গ্রামের বাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে হাতিয়া উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের পশ্চিম বড় দেইল গ্রামে গাফফারের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। হামলাকারীরা বাড়ির জানালার কাচ ভেঙে ফেলে এবং প্রধান ফটকে আঘাত করে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
‘হান্নানের অনেক গোপন তথ্য জানি’
সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া বক্তব্যে আব্দুল গাফফার বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি হান্নান মাসউদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক উত্থানের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তিনি হান্নানকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছেন এবং দীর্ঘ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন।
গাফফারের দাবি, ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ একরামুল করিম চৌধুরীকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দেওয়ার একটি পরিকল্পনা ছিল। সেই প্রক্রিয়ায় তিন কোটি টাকা দাবি করা হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি জানান, এ বিষয়ে আপত্তি জানানোর কারণেই তাঁদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়।
ফেসবুক পোস্ট থেকে শুরু বিতর্ক
গাফফার জানান, তিনি বিষয়টি বিএনপি নেতা মুহাম্মদ রাশেদ খানকে অবহিত করেন। পরে রাশেদ খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে একটি স্ট্যাটাস দিলে সেটি নিজের ফেসবুক ওয়ালে শেয়ার করেন তিনি।
এরপর থেকেই হান্নান মাসউদের অনুসারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে হুমকি ও গালাগাল করতে শুরু করে বলে অভিযোগ করেন গাফফার। তাঁর ভাষ্য, পরিস্থিতি সম্পর্কে হান্নান মাসউদকে জানানো হলেও তিনি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি।
আতঙ্কে বৃদ্ধ বাবা-মা
হামলার ঘটনার পর পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গাফফার। তিনি বলেন, তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মা বাড়িতে একা থাকেন এবং বর্তমানে আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। পরিবার আশঙ্কা করছে, ভবিষ্যতেও হামলার ঘটনা ঘটতে পারে।
ছাত্রদলের অভিযোগ
হাতিয়া উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক রিয়াজ মাহমুদের দাবি, গত কয়েকদিন ধরে প্রকাশ্যে গাফফারকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। তাঁর অভিযোগ, যারা হুমকি দিয়েছে, তারাই হামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত।
এনসিপির পাল্টা বক্তব্য
তবে সব অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে এনসিপি। হাতিয়া উপজেলা এনসিপির আহ্বায়ক সামছুল কিবরিয়া বলেন, গাফফার যেহেতু দৃঢ়ভাবে এনসিপির নেতাকর্মীদের দায়ী করছেন, তাহলে এটাও বিবেচনা করা যেতে পারে যে ঘটনাটি নিজেরাই প্রচারের উদ্দেশ্যে ঘটিয়ে থাকতে পারেন।
তিনি আরও জানান, ঘটনার খবর পেয়ে তিনি রাতেই ঘটনাস্থলে যান এবং সেখানে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি দেখতে পান।
হান্নান মাসউদের জবাব
অভিযোগের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদ বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
তিনি বলেন, আমার নিজের বাড়িতেই হামলা হয়েছে, সেগুলোই সামলাতে পারি না। আমি অন্যের বাড়িতে হামলা করব কেন? পুরো বিষয়টি সাজানো নাটক।
তিন কোটি টাকা দাবির অভিযোগও অস্বীকার করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ নেতাকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে কোনো ধরনের চুক্তি বা অর্থ লেনদেনের প্রশ্নই ওঠে না। রাজনৈতিকভাবে তাঁকে হেয় করতেই এসব অভিযোগ ছড়ানো হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
পুলিশের পর্যবেক্ষণ
হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন জানান, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে, ভবনের দক্ষিণ পাশের অন্ধকার দিক থেকে ছোড়া একটি ইটের টুকরো এসে জানালার অংশবিশেষ ভেঙে দেয়।
তাঁর বক্তব্য, কে বা কারা ইট ছুড়েছে তা কেউ প্রত্যক্ষ করেনি। এ ঘটনায় এখনও কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক
একদিকে তিন কোটি টাকার দাবির বিস্ফোরক অভিযোগ, অন্যদিকে সেই অভিযোগ প্রকাশের পর হামলা-ভাঙচুরের দাবি—সব মিলিয়ে হাতিয়ার রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের এই লড়াই এখন শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই নয়, স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত সত্য সামনে আসবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
