কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগে তোলপাড় গণপূর্তের ই/এম বিভাগ-১১, বিল পেতে ঠিকাদারদের ‘অঘোষিত চাঁদা’ দেওয়ার অভিযোগ। ফাইল ছবি
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগ-১১, ঢাকার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে কমিশন বাণিজ্য, ফাইল আটকে রাখা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলোকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং গণপূর্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, বিভাগটির অধীনে বাস্তবায়নাধীন বিভিন্ন প্রকল্পের বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা আদায়ের একটি অলিখিত প্রথা গড়ে উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ই/এম বিভাগ-১১-এ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম প্রতিটি প্রকল্পের রানিং বিল ও ফাইনাল বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে মোট বরাদ্দের একটি নির্দিষ্ট অংশ কমিশন হিসেবে দাবি করে আসছেন।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এই অর্থ প্রদান না করলে সংশ্লিষ্ট ফাইল দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হয় এবং বিল অনুমোদন প্রক্রিয়া অকারণে বিলম্বিত করা হয়। ভুক্তভোগীদের দাবি, কোনো ঠিকাদার বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কমিশনের দাবি মেনে না নিলে তাদের ফাইলে বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করা হয়। কখনও অতিরিক্ত ব্যাখ্যা, কখনও কাগজপত্রের ঘাটতি কিংবা নতুন নতুন আপত্তির বিষয় তুলে ধরে বিল প্রাপ্তির প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় ফেলে দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ঠিকাদার জানান, সময়মতো বিল না পাওয়ায় তারা মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণ, ধার-দেনা কিংবা ব্যক্তিগত উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে ব্যবসা পরিচালনা করতে হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, প্রশাসনিক হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতি এড়াতে অনেকেই বাধ্য হয়ে অনৈতিক দাবির কাছে নতি স্বীকার করছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ শুধু ঠিকাদারদের ক্ষতির কারণ নয়; বরং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকেও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, সরকারি দপ্তরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী এগোতে পারছে না। ফলে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, সময়ক্ষেপণ এবং জনসাধারণের কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রাপ্তিতে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, সরকারি প্রকল্পে অযৌক্তিক বিলম্ব একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় ব্যয় বাড়িয়ে দেয়, অন্যদিকে প্রশাসনিক দক্ষতা ও জবাবদিহিতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য হলে তা সরকারের ঘোষিত দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং প্রশাসনিক সুশাসনের জন্য উদ্বেগজনক।
সচেতন মহলের দাবি, বিষয়টি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। একই সঙ্গে সরকারি প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় অনলাইন ফাইল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা, ডিজিটাল মনিটরিং এবং বিল অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অধিকতর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে কোনো কর্মকর্তা এককভাবে ফাইল আটকে রেখে ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ না পান।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ফলে এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগগুলোর সত্যতা, সংশ্লিষ্টদের দায় এবং প্রশাসনিক অনিয়মের বিষয়গুলো তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন প্রশ্ন উঠেছে—গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম বিভাগ-১১-এ অভিযোগকৃত কমিশন বাণিজ্য ও ফাইল জিম্মি করে বিল অনুমোদনের সংস্কৃতি আদৌ বিদ্যমান কি না, নাকি এটি কেবল ক্ষুব্ধ ঠিকাদারদের অভিযোগ? এর উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত।
বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে……..
