সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে ধনাঢ্য, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে সম্পর্ক গড়ে তোলা, পরে ব্যক্তিগত মুহূর্ত ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে কথিত একটি ‘হানি ট্র্যাপ’ চক্রের বিরুদ্ধে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সিতুল মুনা চৌধুরী ও প্রতারক মোস্তফা নামে দুই ব্যক্তি।
একাধিক ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চক্রটি প্রথমে ফেসবুক, মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক আকর্ষণীয় আইডি ব্যবহার করে টার্গেট ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচয় গড়ে তোলে। বন্ধুত্ব থেকে প্রেম, এরপর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে ভিডিও কল, ব্যক্তিগত আলাপচারিতা এবং অন্তরঙ্গ মুহূর্ত গোপনে ধারণ করা হয়। পরে সেই ছবি বা ভিডিও দেখিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়, চাঁদাবাজি ও ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, বারিধারা, নিকেতন, উত্তরা ও মিরপুরের বিভিন্ন ভাড়া করা ফ্ল্যাট, রিসোর্ট ও হোটেল ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, মুনা ও মোস্তফা নিজেদের স্বামী–স্ত্রী পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় বাসা ভাড়া নিতেন। যদিও তাদের প্রকৃত সম্পর্ক নিয়ে নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চক্রটির বিরুদ্ধে অতীতেও একাধিক ধনাঢ্য ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীকে টার্গেট করার অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, ফেসবুকে পরিচয়ের পর মুনার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে বিভিন্ন সময়ে টাকা ধার নেওয়ার পাশাপাশি একাধিকবার দেশের বাইরে ও হোটেলে অবস্থানের সময় গোপনে ভিডিও ধারণ করা হয় বলে তার দাবি। ওই কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, তার কাছ থেকে প্রায় ৪০ লাখ টাকা নেওয়ার পর আরও ৫০ লাখ টাকা দাবি করা হয় এবং অর্থ না দিলে ব্যক্তিগত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
আরও কয়েকজন ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে তাদের কাছ থেকে মাসোহারা আদায় করা হয়েছে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ব্যক্তিগত ভিডিও প্রকাশ, মিথ্যা মামলা ও সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার ভয় দেখানো হয়েছে বলেও তারা দাবি করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, গোলাম মোস্তফা কখনো চিকিৎসক, কখনো সাংবাদিক পরিচয়ে বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ স্থাপন করতেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গোয়েন্দা সূত্রের ভাষ্য, বর্তমানে দেশে সক্রিয় হানি ট্র্যাপ চক্রগুলো সাধারণত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পর্ক গড়ে তুলে ব্যক্তিগত দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে আর্থিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করে। অনেক ক্ষেত্রে এসব চক্রের সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত প্রতারক নেটওয়ার্কের যোগাযোগ থাকতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, হানি ট্র্যাপ বর্তমানে একটি সংগঠিত অপরাধে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে মানুষকে ফাঁদে ফেলার ঘটনা বাড়ছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি বা ভিডিও শেয়ার করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। কারণ এসব তথ্য অনেক সময় ব্ল্যাকমেইল ও প্রতারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা সাধারণ মানুষকে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, কেউ যদি এ ধরনের প্রতারণার শিকার হন, তাহলে দ্রুত নিকটস্থ থানায় বা সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করা উচিত।
তবে এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত সব অভিযোগই অভিযোগকারীদের দাবি ও বিভিন্ন সূত্রের বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপিত। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়ার সুযোগ থাকলে তা প্রকাশ করা হবে।
আদ্যোপান্ত থাকছে পরবর্তী সংখ্যায়। চলবে…….
