রাজধানীর মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম, ঘুষ-বাণিজ্য ও দুর্নীতির অভিযোগ ঘুরে বেড়াচ্ছে। দেশের বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সেবা পেতে ঘুষ যেন এক অলিখিত নিয়মে পরিণত হলেও, মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সেই চিত্র আরও ভয়াবহ ও সুসংগঠিত রূপ নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সেবা গ্রহীতা, ভুক্তভোগী এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সাব-রেজিস্টার আব্দুল কাদির এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত সহকারী সাব-রেজিস্টার হারিস। অভিযোগকারীদের দাবি, এই দুই কর্মকর্তার নেতৃত্বেই অফিসে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী ঘুষ ও দালালনির্ভর সিন্ডিকেট, যেখানে সরকারি সেবা যেন নির্ধারিত ফি নয়, বরং অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়েই নিশ্চিত হয়।
সূত্রগুলোর অভিযোগ, আব্দুল কাদির নিজের পছন্দের কর্মস্থলে পদায়ন নিশ্চিত করতে কয়েক কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন করেছিলেন। আর সেই অর্থ পুনরুদ্ধার এবং বিপুল অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলতেই তিনি দায়িত্ব ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে অফিসে ঘুষের এক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
জমি ক্রয়-বিক্রয়ের দলিল নিবন্ধনের প্রতিটি ধাপেই নাকি নির্ধারিত রয়েছে আলাদা ঘুষের হার। কেউ অতিরিক্ত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার ফাইল দিনের পর দিন আটকে রাখা হয়, অযৌক্তিক ত্রুটি দেখিয়ে ফেরত পাঠানো হয় কিংবা বিভিন্ন অজুহাতে হয়রানির শিকার হতে হয়। বিপরীতে, দালাল চক্রের মাধ্যমে নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করলেই অল্প সময়ে কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়। ভুক্তভোগীদের ভাষায়, এটি যেন ঘুষ দিলে দ্রুত সেবা, না দিলে অনির্দিষ্ট অপেক্ষা—এমন এক অনৈতিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এই পুরো সিন্ডিকেট পরিচালনায় আব্দুল কাদিরকে সরাসরি সহায়তা করেন সহকারী সাব-রেজিস্টার হারিস। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের বাসিন্দা হারিস গত কয়েক বছরে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, নিজ গ্রামে তিনি ইতোমধ্যে নির্মাণ করেছেন একটি দৃষ্টিনন্দন পাঁচতলা ভবন, যার নির্মাণব্যয় তার সরকারি বেতন-ভাতার সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এছাড়া রাজধানীর মিরপুর এলাকায় তার নামে বাড়ি ও একাধিক ফ্ল্যাট থাকার অভিযোগও রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি চাকরিজীবীর সীমিত আয়ের বিপরীতে এত বিপুল সম্পদের উৎস কোথায়? বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট সংস্থার তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
এদিকে সাব-রেজিস্টার আব্দুল কাদিরের সম্পদের পরিমাণ নিয়েও নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। সহকর্মী, ভুক্তভোগী এবং সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তার নিজের নামে কিংবা পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ জমি, বাড়ি ও ফ্ল্যাট রয়েছে। অভিযোগ আরও রয়েছে, মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রতিদিন ঘুষের মাধ্যমে যে বিপুল অর্থ লেনদেন হয়, তার বড় একটি অংশ আব্দুল কাদিরের নির্দেশনায় সংগ্রহ করা হয়। ঘুষের হার নির্ধারণ থেকে শুরু করে দালালদের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ—সবকিছুই তার প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয় বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
স্থানীয়দের মতে, এই দুই কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডে মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে একটি নৈরাজ্যকর, ভয়ভীতিনির্ভর ও দুর্নীতিগ্রস্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি সেবা নিতে এসে সাধারণ মানুষকে আর্থিক ক্ষতি, হয়রানি ও দীর্ঘসূত্রতার শিকার হতে হচ্ছে।
অনেকেই অভিযোগ করছেন, জনগণের সেবার জন্য প্রতিষ্ঠিত একটি সরকারি অফিসকে ব্যক্তিগত অর্থ উপার্জনের কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে।
সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন, যদি এসব অভিযোগের সত্যতা থাকে, তবে এতদিন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি কোথায় ছিল? কেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? তাদের মতে, অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে আব্দুল কাদির ও হারিসের আয়-ব্যয়ের হিসাব, সম্পদের উৎস এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
তবে উল্লেখ্য, উল্লিখিত সব তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিভিন্ন সূত্রের অভিযোগের ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
