চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যস্ততম জেনারেল কার্গো বার্থে প্রতিদিন হাজার হাজার খালি কন্টেইনার এক ইয়ার্ড থেকে অন্য ইয়ার্ডে ছুটে চলে। বাইরে থেকে এটি নিছক একটি কারিগরি সেবা। কিন্তু এই কন্টেইনারের চাকার নিচেই ঘুরছে বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকার নিশ্চিত আয়ের এক বিশাল অর্থচক্র—যার নিয়ন্ত্রণ থেকে গত ১৭ বছরেও বের হতে পারেনি দেশের অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান।
নতুন টেন্ডার আহ্বানের পর সেই পুরোনো প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে—প্রতিযোগিতার দরজা কি সত্যিই খোলা, নাকি অদৃশ্যভাবে আগেই নির্ধারণ করে রাখা হয়েছে বিজয়ীর নাম?
বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নতুন দরপত্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত যেন ইট-সিমেন্ট দিয়ে গড়া এক একটি ‘৫০ কোটির দেয়াল’। সেই দেয়াল টপকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা কার্যত রয়েছে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠানের—এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস এবং সাইফ পাওয়ারটেক। আর দেশের শত শত অভিজ্ঞ লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান, আইসিডি (অফডক) অপারেটর ও বার্থ অপারেটররা শুরুতেই প্রতিযোগিতার মাঠের বাইরে ছিটকে পড়ছেন।
দরপত্রে বলা হয়েছে, আবেদনকারীকে গত ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের কোনো সমুদ্রবন্দরে নিজস্ব যন্ত্রপাতি দিয়ে অন্তত ৫০ কোটি টাকার একই ধরনের কাজ সম্পন্ন করতে হবে। থাকতে হবে ১২ কোটি টাকার বার্ষিক টার্নওভার এবং ১০৫ কোটি টাকার আর্থিক সক্ষমতা।
প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশে যখন কার্যত এই ধরনের কাজ নিয়মিত হয় কেবল চট্টগ্রাম বন্দরে, তখন এমন শর্ত পূরণ করবে কারা? এটি কি যোগ্যতা যাচাই, নাকি প্রতিযোগীদের প্রবেশপথেই তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার কৌশল?
ব্যবসায়ীদের ভাষায়, এটি এমন এক ‘ক্যাচ-২২’—যেখানে আগে কাজ না করলে টেন্ডারে অংশ নেওয়া যাবে না, আবার টেন্ডারে অংশ নেওয়ার সুযোগ না থাকলে সেই অভিজ্ঞতাও কখনো অর্জন করা সম্ভব নয়।
এক টেন্ডার, অসংখ্য প্রশ্ন
শুধু অভিজ্ঞতার শর্তই নয়, আর্থিক যোগ্যতার মানদণ্ডও কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে। আগের টেন্ডারে যেখানে এক কোটি টাকার টার্নওভারই যথেষ্ট ছিল, সেখানে এবার তা করা হয়েছে ১২ কোটি টাকা। নতুন করে যুক্ত হয়েছে ১০৫ কোটি টাকার সক্ষমতার শর্ত।
এর পাশাপাশি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে ব্র্যান্ড নিউ এম্পটি হ্যান্ডলার ও ট্রাক্টর-ট্রেইলার, যার উৎপাদনের বয়স এক বছরের বেশি হতে পারবে না।
অথচ অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়েই একই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
‘ব্র্যান্ড নিউ’ শর্ত, কিন্তু পুরোনো খেলোয়াড়ই সুবিধায়?
বন্দরসংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন—যদি পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে এতদিন কাজ চলেই থাকে, তাহলে নতুন প্রতিযোগীদের জন্য হঠাৎ এত কঠোর শর্ত কেন?
কেন কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে নতুন বহর কিনে টেন্ডারে অংশ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হলো?
এই প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
১৭ বছরের একই গল্প
২০১৩ সালে উন্মুক্ত দরপত্রে কাজ পায় এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস।
এরপর ২০১৭, ২০২০ ও ২০২৩—প্রতিবারই টেন্ডার, মামলা, স্থগিতাদেশ, তারপর সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি (ডিপিএম)। শেষ পর্যন্ত কাজ থেকে যায় একই প্রতিষ্ঠানের হাতেই।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রতিবারই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যাতে আইনি জটিলতার সুযোগে প্রতিযোগিতা থেমে যায়, কিন্তু কাজ থেমে থাকে না—চলতে থাকে একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে।
প্রতিযোগিতা নাকি পূর্বনির্ধারিত গন্তব্য?
বন্দর পরিচালনাকারী মালিকদের সংগঠন লিখিতভাবে অভিযোগ করেছে, বর্তমান শর্ত বহাল থাকলে বাস্তবে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠানই অংশ নিতে পারবে। এতে সরকার সাশ্রয়ী মূল্যে কাজ পাওয়ার সুযোগ হারাবে এবং উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মূল দর্শনই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
অভিযোগ আরও রয়েছে, সরকারি ক্রয় বিধিমালার (পিপিআর) উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার নীতির সঙ্গে এই শর্তগুলোর সামঞ্জস্য নেই।
প্রশ্নের মুখে নীরবতা
অভিযোগের বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান লিখিত প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি। তবে সাইফ পাওয়ারটেকের পক্ষ থেকেও অভিযোগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেসের কর্ণধার শাহাদাত হোসেন সেলিম দাবি করেছেন, পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়া পিপিআর ও সিপিটিইউর নির্দেশনা অনুসারেই হয়েছে এবং কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
উল্লেখ্য প্রত্যাশা
চট্টগ্রাম বন্দরের এই লাভজনক কাজকে ঘিরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—
‘৫০ কোটির দেয়াল’ কি ভেঙে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার নতুন অধ্যায় শুরু হবে, নাকি ১৭ বছরের পুরোনো ইতিহাসই আবার নতুন করে লেখা হবে?
