বৃহস্পতিবার, ১৬ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মেরামতের নামে কোটি টাকার ‘হরিলুট’, গণপূর্তের ই/এম বিভাগ-১১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ

আবদুর রহমান
জুলাই ১৬, ২০২৬ ১২:০২ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগ-১১-এ মেরামত ও সংরক্ষণ খাতে কোটি কোটি টাকার সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে কমিশন বাণিজ্য, বিল আটকে রাখা, ভুয়া কাজ দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তার এসব কর্মকাণ্ডে একদিকে ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা আর্থিক সংকটে পড়ছেন, অন্যদিকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, ই/এম বিভাগ-১১-এর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম প্রায় প্রতিটি প্রকল্পের রানিং ও ফাইনাল বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে মোট বরাদ্দের একটি নির্দিষ্ট অংশ কমিশন হিসেবে দাবি করেন। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি এখন বিভাগটিতে প্রায় অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।

ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের অভিযোগ, দাবিকৃত অনৈতিক অর্থ পরিশোধ না করলে বিলের ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়। কেউ প্রতিবাদ করলে তাদের ফাইলে অযৌক্তিক প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করা হয়। কখনও অতিরিক্ত ব্যাখ্যার অজুহাত, আবার কখনও কৃত্রিম কাগজপত্রের ঘাটতি দেখিয়ে বিল অনুমোদন ঝুলিয়ে রাখা হয়। ফলে শতভাগ কাজ সম্পন্ন করেও দীর্ঘ সময় বিলের অর্থ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ঠিকাদাররা।

বিশেষ করে পরিচালন বাজেটের মেরামত ও সংরক্ষণ খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যবহারে ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। সরকারি বরাদ্দসংক্রান্ত নথি ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা মেট্রোপলিটন জোনের অধীন গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-১১, ঢাকা-এর অনুকূলে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও অভিযোগ অনুযায়ী এর বড় একটি অংশ কাগজে-কলমে ভুয়া কাজ দেখিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে।

সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে মেরামত ও সংরক্ষণ খাতের ‘৩২৫৮১০৬-আবাসিক ভবন’ কোডে ৭৩টি কাজের বিপরীতে মোট ৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তিতে ৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা এবং তৃতীয় ও চতুর্থ কিস্তিতে ৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ছাড় করা হয়।

অন্যদিকে ‘৩২৫৮১০৭-অনাবাসিক ভবন’ কোডে ৩৮টি কাজের বিপরীতে ১ কোটি ১৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তিতে ৬০ লাখ টাকা এবং তৃতীয় ও চতুর্থ কিস্তিতে ৫৯ লাখ টাকা ছাড় করা হয়। অর্থাৎ আবাসিক ও অনাবাসিক—দুই খাত মিলিয়ে ১১১টি কাজের বিপরীতে মোট ৮ কোটি ৪২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।

অনুসন্ধানে অভিযোগ পাওয়া গেছে, এই বিপুল বরাদ্দের বড় অংশই বাস্তব কাজ ছাড়াই অথবা নিম্নমানের কাজ দেখিয়ে উত্তোলন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা অনানুষ্ঠানিকভাবে পুরো ঘটনাকে ‘সরকারি অর্থের হরিলুট’ বলে মন্তব্য করেছেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম ক্ষমতার অপব্যবহার করে লাইসেন্সবিহীন বেনামি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, ভুয়া মাস্টাররোলের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা উত্তোলন এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নজিরবিহীন কারচুপির সঙ্গে জড়িত।

অর্থ বিভাগের কঠোর নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও কোড বহির্ভূত খাতে অর্থ ব্যয় এবং পূর্ববর্তী বছরের ভুয়া বকেয়া বিল পরিশোধ দেখানোর অভিযোগও রয়েছে, যা গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের পরিপত্রের পরিপন্থী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণপূর্ত অধিদপ্তরের হিসাব শাখার এক কর্মকর্তা জানান, ৩২৫৮১০৬ ও ৩২৫৮১০৭ কোডের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কাজ শুরুর আগে সুবিধাভোগী সংস্থা বা বাসিন্দাদের অবহিত করা এবং কাজ শেষে লিখিত প্রত্যয়নপত্র গ্রহণ বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো প্রত্যয়নপত্র ছাড়াই বিল পাস করা হয়েছে।

অনেক সরকারি কোয়ার্টারের বাসিন্দা এবং অনাবাসিক ভবনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা লিখিতভাবে জানিয়েছেন, গত এক বছরে তাদের ভবনে কোনো বৈদ্যুতিক তার পরিবর্তন, পাম্প মেরামত কিংবা জেনারেটর সংক্রান্ত কাজ হয়নি। অথচ সরকারি নথিতে কোটি কোটি টাকার কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে বলে উল্লেখ করে বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।

এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ একজন প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কারচুপি ও জালিয়াতির মাধ্যমে গণপূর্তের বৈধ লাইসেন্স ও পূর্ব অভিজ্ঞতাবিহীন একাধিক বেনামি ও ছদ্মবেশী প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে এবং এর নেপথ্যে নির্বাহী প্রকৌশলীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এছাড়া তার কার্যালয়ে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে একাধিক লিখিত অভিযোগ দপ্তরে জমা পড়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আলমগীর হোসেন বলেন, এখানে যে কাজ হয়েছে, তা নিয়ম অনুযায়ী প্রাক্কলন অনুমোদনের জন্য আমার দপ্তরে আসার কথা থাকলেও কোনো ফাইল আমার অফিসে আসেনি। কেউ যদি কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ