চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে নিয়োগ পেতে তদবিরের উদ্দেশ্যে ৭০ কোটি টাকার লেনদেন ও চুক্তির অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের উপসচিব ও কন্ট্রোলার অব স্টোর্স মো. সালাহউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে। এ-সংক্রান্ত বেশ কিছু চুক্তিপত্র, স্বাক্ষর করা চেক, সার্ভিস প্রোফাইল ও অন্যান্য নথি সামনে এসেছে।
তবে এসব নথিতে উল্লেখ থাকা আর্থিক প্রতিশ্রুতি বা কথিত চুক্তির ভিত্তিতে কোনো পদ বাস্তবে অর্থের বিনিময়ে পাওয়া হয়েছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নথিতে থাকা কিছু দাবি স্বাধীনভাবেও যাচাই করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, প্রশাসন ক্যাডারের ২৮তম ব্যাচের উপসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদকে গত বছরের শেষ দিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে বদলি করা হয়। এর আগে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নথিপত্রে দাবি করা হয়েছে, বিপুল অর্থের বিনিময়ে তিনি চট্টগ্রামের ডিসি পদে নিয়োগ পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
শুরু ৪ কোটি টাকার কথিত ঋণচুক্তি দিয়ে
নথিপত্র অনুযায়ী, ঘটনাপ্রবাহের শুরু গত বছরের ২৪ নভেম্বর। ওই দিন ঢাকার ধানমন্ডির বাসিন্দা আহমেদ শাকিল খানের সঙ্গে ১০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন সালাহউদ্দিন।
তখন তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। চুক্তিতে শাকিল খানের কাছ থেকে সালাহউদ্দিনের ৪ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে এই ঋণের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরে ব্যবসার সুযোগ ও কাজের সম্পর্ক থাকার কথাও বলা হয়েছে।
ঋণের নিরাপত্তা হিসেবে সালাহউদ্দিন তার সিটি ব্যাংকের হিসাব থেকে দুটি চেক দেন। প্রতিটি চেকের মূল্য ২ কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট ৪ কোটি টাকা।
বদলি, পদায়ন এবং অসন্তোষ
এর প্রায় এক মাস পর, ১৭ ডিসেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সালাহউদ্দিনকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক পদে বদলির আদেশ দেয়। ২৩ ডিসেম্বর তিনি সেখানে যোগ দেন।
তবে পরিচালক পদটি তখন শূন্য ছিল না। পরে ৮ জানুয়ারি প্রশাসনিক কারণ দেখিয়ে তাকে কন্ট্রোলার অব স্টোর্স পদে পদায়ন করা হয়।
এরপর সালাহউদ্দিন ও অজ্ঞাত এক ব্যক্তির মধ্যে কথিত একটি হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথন সামনে আসে। সেখানে তার পদায়ন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশের কথা দেখা যায়। বার্তায় তিনি দাবি করেন, তাকে একটি নির্দিষ্ট পদে দেওয়ার কথা থাকলেও পরে পদাবনতি দিয়ে অন্য জায়গায় পাঠানো হয়েছে এবং তিনি ‘নিঃস্ব’ হয়ে গেছেন।
ওই কথোপকথনে পদায়নের ব্যবস্থা কে করেছিলেন—এ বিষয়ে তিনি জানেন বলেও ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সেখানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নথিতে ওই ব্যক্তির পরিচয় স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
সালাউদ্দিনের ফেসবুকে কথোপকথন
ডিসি হওয়ার লিখিত ঘোষণা
নথিপত্র অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে পদায়নের পরও কাঙ্ক্ষিত পদ পাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৯ মার্চ সালাহউদ্দিন একটি লিখিত ঘোষণায় স্বাক্ষর করেন। এতে বলা হয়, তাকে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলে ওই পদে দায়িত্ব পালনে তার কোনো আপত্তি নেই।
একই নথির ধারাবাহিকতায় পটুয়াখালীর বাউফলের মো. হাবিবুর রহমানকে প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়। সালাহউদ্দিনের পক্ষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার ক্ষমতা তাকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
৭০ কোটি টাকার কথিত চুক্তি
এরপর সামনে আসে সবচেয়ে বড় অঙ্কের আর্থিক চুক্তির দাবি। ১৬ জুলাই তারিখের একটি নথিতে সালাহউদ্দিনের কথিত স্বাক্ষর রয়েছে। সেখানে চট্টগ্রামের ডিসি পদে নিয়োগের সঙ্গে ৭০ কোটি টাকার একটি চুক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ওই পদে নিয়োগ পাওয়ার পর ১৮ মাসের মধ্যে ‘কাজের মাধ্যমে’ ১৪০ কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে ‘কাজের মাধ্যমে’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, একজন সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে আইনগতভাবে এত বিপুল অর্থ উপার্জন করবেন কিংবা অর্থটি শেষ পর্যন্ত কার কাছে যাওয়ার কথা ছিল—এসব বিষয়ে নথিতে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।
সালাউদ্দিনের সাথে চুক্তি পত্রে স্বাক্ষরিত কপি
১২ চেকে ১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা
পর্যালোচনা করা নথিতে সোনালী ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকের মোট ১২টি চেক পাওয়া গেছে। এসব চেকের মোট মূল্য ১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
অভিযোগ অনুযায়ী, কাঙ্ক্ষিত পদে নিয়োগের চেষ্টার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কথিত আর্থিক ব্যবস্থায় এসব চেক নিরাপত্তা হিসেবে দেওয়া হয়েছিল।
এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের বগুড়া করপোরেট শাখার পাঁচটি চেকের মোট মূল্য ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আর সিটি ব্যাংকের সাতটি চেকের মূল্য ৫ কোটি টাকা।
নথিতে আরও দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সালাহউদ্দিন তার সরকারি সিল ও স্বাক্ষরযুক্ত সার্ভিস প্রোফাইলের কপি দেন। তার বোন জিনিয়াত খাতুনের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপিও দেওয়া হয়েছিল।
পর্যালোচনা করা নথি অনুযায়ী, এসব কাগজপত্র দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল কথিত লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত মধ্যস্থতাকারীদের আশ্বস্ত করা। তবে এসব নথির সত্যতা, ব্যবহার এবং কথিত লেনদেনের বাস্তবতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।
অভিযোগ অস্বীকার সালাহউদ্দিনের
অভিযোগের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, তার মুঠোফোন হ্যাক করা হয়েছিল, চেক হারিয়ে গিয়েছিল এবং তার জাতীয় পরিচয়পত্র চুরি হয়েছিল।
পরে তিনি বলেন, সচিবালয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠী নিয়মিত কর্মকর্তাদের কাছে বিভিন্ন ধরনের প্রস্তাব নিয়ে যায়। তবে তিনি কোনো পদ পাওয়ার জন্য অর্থ দেওয়ার কথা স্বীকার করেননি।
তদন্তে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ
এদিকে অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় বিষয়টি তদন্তে এক সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানিয়েছেন, বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার স্বার্থে তদন্ত কমিটির সদস্যদের পরিচয় জানাতে রাজি হননি তিনি।
সব মিলিয়ে চুক্তিপত্র, চেক ও অন্যান্য নথিতে উঠে আসা কোটি কোটি টাকার এই আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ এখন তদন্তের মুখে। কথিত ৭০ কোটি টাকার চুক্তি আদৌ বাস্তব ছিল কি না, নথিগুলোর স্বাক্ষর ও দাবিগুলোর সত্যতা কতটা এবং এর পেছনে কোনো প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন নির্ভর করছে তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর।
