খাতা-কলমে শতভাগ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) কোটি কোটি টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। নির্মাণকাজ অর্ধেক রেখেই শতভাগ বিল পরিশোধ, নথিতে অসামঞ্জস্যপূর্ণ পরিমাপ দেখানো এবং সরকারি দপ্তরে বসে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে নিয়ন্ত্রণকারী দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
এসব অভিযোগের অনুসন্ধানে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা ও বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাসান শওকতের নাম সামনে এসেছে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রভাবশালী ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে রাজধানীর একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নকাজে জাল নথি, অসামঞ্জস্যপূর্ণ পরিমাপ এবং কাজের অগ্রগতির সঙ্গে মিল না থাকা বিলের মাধ্যমে সরকারি অর্থ ছাড়ের ঘটনা ঘটেছে।
এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে আরও দাবি করা হয়েছে, হাসান শওকতের বিরুদ্ধে নিজ দপ্তরে বসে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ গ্রহণের ভিডিও এবং ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে স্ত্রী ও স্বজনদের নামে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিপুল পরিমাণ জমি, রিসোর্ট ও বহুতল ভবনসহ সম্পদের তথ্য পাওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাস্তবে ৮ তলা, নথিতে ১০ তলার বিল
পুরান ঢাকার শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ের একটি একাডেমিক ভবন নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। নথিপত্র অনুযায়ী, ১০ তলা ভবনের নির্মাণকাজ ২০২১ সালে সম্পন্ন দেখানো হয়। একই বছর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘বিল্ডার্স-সিডব্লিউবিডি জেভি’ বিল জমা দেয়। সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা ভবনটির গুণগত মান পরিদর্শন শেষে ২০২২ সালের ১৩ জুন বিল ছাড় করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু বিল পরিশোধের প্রায় চার বছর পর সরেজমিনে ভবনটির বাস্তব চিত্র নিয়ে দেখা দিয়েছে বড় প্রশ্ন। প্রতিবেদনের দাবি, ভবনটি বর্তমানে অষ্টম তলা পর্যন্ত নির্মিত অবস্থায় রয়েছে; নবম ও দশম তলার কোনো অবকাঠামো নেই।
অথচ নথিতে ভুয়া বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ পরিমাপ দেখিয়ে নবম ও দশম তলার ছাদ, ঢালাই, রড, ওয়াটার প্রুফিংসহ বিভিন্ন কাজের বিপরীতে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ করা হয়েছে।
নথিপত্রে দেখা যায়, ২০২২ সালের ১৩ জুন ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার সপ্তম চলতি বিলে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে মো. হাসান শওকত স্বাক্ষর করে অর্থ ছাড়ের অনুমোদন দেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
পরিমাপ বইয়ের ৪৬ থেকে ৯৪ নম্বর পৃষ্ঠা বিশ্লেষণের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৯ম ও ১০ম তলার বিভিন্ন নির্মাণকাজ, ওয়াটার প্রুফিং, সাটারিং, পিলার, লিন্টেল, ছাদ ঢালাই, সিঁড়ি, রড ও নিরাপত্তা বেষ্টনীসহ বিভিন্ন খাতে বিল উত্তোলন করা হয়েছে।
কিন্তু সরেজমিন পরিদর্শনে ভবনটি অষ্টম তলা পর্যন্ত নির্মিত পাওয়া গেলে প্রশ্ন উঠেছে—নবম ও দশম তলার কাজ বাস্তবে না থাকলে এসব কাজের বিল কীভাবে পরিশোধ করা হলো?
শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ের ১০ম তলা পর্যন্ত বিল উত্তোলন করা হলেও ৮ম তলা পর্যন্ত নির্মিত ভবন। ছবি: সংগৃহীত
এ বিষয়ে শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ রোজিনা শাহীনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘বিল্ডার্স-সিডব্লিউবিডি জেভি’র প্রধান লিয়াকত শিকদারের বক্তব্য জানতে ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাজধানীর আরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিল নিয়ে প্রশ্ন
শুধু শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয় নয়, রাজধানীর আরও কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজের অগ্রগতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিল দেওয়ার অভিযোগের তথ্য প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
২০২২ সালের ৯ জুন মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ সংস্কারকাজের জন্য ‘মেসার্স মেড-ইন বাংলাদেশ’কে ১১ লাখ ৬৮ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান হিসেবে তৎকালীন মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস হোসেনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান শওকত কাজটি গুণগতভাবে সম্পন্ন হয়েছে উল্লেখ করে ৮ লাখ টাকার বিল দেওয়ার সুপারিশ করেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদনের দাবি, তখনও কাজটি সম্পূর্ণ হয়নি। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর বাকি কাজ শেষ হয়েছে দেখিয়ে আরও ৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকার বিল পরিশোধ করা হয়।
এ ছাড়া ২০২২-২৩ অর্থবছরে ওয়েস্ট ধানমন্ডি ইউসুফ উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ তলা ভবন নির্মাণের জন্য ‘মেসার্স এমএসবি-এমসিবিএল জেভি’কে কার্যাদেশ দিয়ে কাজ ছাড়াই ১০ লাখ টাকা বিল দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
একইভাবে পুরান ঢাকার কোতোয়ালি থানার আনোয়ারা বেগম মুসলিম গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে কাজ না করেই ১৯ লাখ টাকার বিল পরিশোধের অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
দপ্তরে বসে বস্তাভর্তি টাকা—ভিডিও ঘিরে তোলপাড়
অনুসন্ধানে ২০২২ সালের চারটি ভিডিও ফুটেজ পাওয়ার দাবি করেছে এশিয়া পোস্ট। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভিডিওতে প্রকৌশলী হাসান শওকতকে সরকারি অফিসের নিজ কক্ষে বসে থাকতে দেখা যায়। তার সামনে টেবিলের ওপর বস্তা থেকে ব্যাগভর্তি নগদ টাকা বের করে রাখার দৃশ্যও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
চারটি ভিডিওর উৎস, দৃশ্যমান তথ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় আলাদাভাবে যাচাই করা হয়েছে বলে জানিয়েছে এশিয়া পোস্ট। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, ভিডিওর দৃশ্যমান অংশে স্পষ্ট সম্পাদনার চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
ভিডিওতে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের প্রচার সম্পাদক রাকিব হোসেন মিরন, ঢালী কনস্ট্রাকশনের ঠিকাদারসহ কয়েকজনকে টাকা গুনতে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উপস্থিত ঠিকাদারদের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে, এসব অর্থ প্রকৌশলী হাসান শওকতকে দেওয়া হয়েছিল।
একজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, ২০২২ সালে কাজ দেওয়ার বিনিময়ে প্রকৌশলী হাসান শওকত একজন ঠিকাদারের কাছ থেকে ২ কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
মিরন এন্টারপ্রাইজের বিপুল কাজের হিসাব
সরকারি নথির বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী যুবলীগের প্রচার সম্পাদক রাকিব হোসেন মিরন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে ‘M/S Miron Enterprise’ ও ‘M/S MERON ENTERPRISE’ নামে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করেছেন।
২০১৮ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ‘M/S Miron Enterprise’ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রথম দরপত্র পায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে সারাদেশে ২৩৩টি কাজ এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১১৯টি দরপত্রে ৬৯ কোটি ৩ লাখ টাকা কাজের তথ্য ইজিপিতে পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এর মধ্যে হাসান শওকতের ঢাকা মেট্রো জোনে দায়িত্ব পালনের সময় ৯০টি দরপত্রে প্রায় ৪২ কোটি টাকার কাজ করার তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ‘M/S MERON ENTERPRISE’ লাইসেন্সের মাধ্যমে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ৯৩টি কাজ এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে ১২টি কাজ করার তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। মেট্রো জোনে ১১টি দরপত্রে প্রায় ৬ কোটি ২৯ লাখ টাকার কাজের তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে রাকিব হোসেন মিরনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
স্ত্রী ও স্বজনদের নামে সম্পদের পাহাড়ের অভিযোগ
সরকারি নথি ও অনুসন্ধানের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চাকরির সুবাদে হাসান শওকত নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। স্ত্রী ফেরদৌসী খানমকে সরকারি তথ্যে গৃহিণী হিসেবে উল্লেখ করা হলেও তার নামে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জমি, রিসোর্টসহ বিপুল সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে স্ত্রীর নামে সারাদেশে মোট ১৮৪.৩৩ শতক জমি থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। খুলনার ডুমুরিয়া, দিঘলিয়া, মেহেরপুর সদর, মাগুরা সদরসহ বিভিন্ন এলাকায় জমির বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন বরুয়া এলাকায় জমির ওপর আলিশান বাড়ি এবং দক্ষিণখান এলাকায় নিজের ও স্ত্রীর নামে ১০ তলা ভবন থাকার তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগের জবাব দিলেন হাসান শওকত
টাকা লেনদেনের ভিডিও সম্পর্কে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রোপলিটন সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাসান শওকতের বক্তব্য নিয়েছে এশিয়া পোস্ট।
ভিডিওর সত্যতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ঠিকাদাররা নিজেদের মধ্যে টাকা বিনিময় করছেন।
একটি ভিডিওতে একজনকে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘ঠিকাদাররা নিজেরাই টাকা বিনিময় করছেন, এর মধ্যে আমাকে ওই পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছেন।
তবে ঠিকাদাররা তার কক্ষে কেন টাকা লেনদেন করছিলেন এবং পাঁচ লাখ টাকা কী কারণে তাকে দেওয়া হয়েছিল—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি অভিযোগগুলোকে ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেন।
কাজ না করে বিল উত্তোলন এবং স্ত্রীর নামে সম্পত্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এসব বিষয়ে কোনো উত্তর দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
‘ঘটনা ঘটে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’
অভিযোগের বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ফলে প্রশ্ন এখন একটাই—কাজ শেষ হওয়ার আগেই যদি শতভাগ বিল দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেই অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়ায় কারা জড়িত ছিলেন? নথির পরিমাপ, বাস্তব নির্মাণকাজ ও অর্থ ছাড়ের মধ্যে যদি অসঙ্গতি থেকে থাকে, তার দায়ই বা কার?
অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হলে প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা।
