বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ড্রেজিং বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. ছাইদুর রহমানকে ঘিরে ১৩৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকার নদী খনন প্রকল্পে অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে।
অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে আবদুর রহমান নামে এক সাংবাদিক গত ১৩ আগস্ট ২০২৬ জনস্বার্থে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দিয়েছেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, নেত্রকোনার কংস ও ভোগাই নদী খননের নামে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলেও প্রকল্প শেষে নদীর কাঙ্ক্ষিত নাব্যতা ফিরে আসেনি। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিমাণ, ড্রেজিংয়ের হিসাব, মাটি অপসারণ, ঠিকাদারি বিল এবং প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
১৩৪ কোটি টাকা ব্যয়, তবু ফেরেনি নদীর নাব্যতা
অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, মোহনগঞ্জ থেকে নালিতাবাড়ী পর্যন্ত প্রায় ১৫৫ কিলোমিটার নৌপথ খননের কাজ ‘অভ্যন্তরীণ নৌপথের ৫৩টি রুটে ক্যাপিটাল ড্রেজিং (প্রথম পর্যায়ে ২৪টি নৌপথ)’ প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়ন করা হয়।
প্রকল্পের নকশা ও প্রাক্কলন অনুযায়ী, ড্রেজিং শেষে শুষ্ক মৌসুমেও নদীতে নির্ধারিত গভীরতার পানি থাকার কথা। এ কাজে ড্রেজার, এক্সকাভেটর ও শ্রমিক ব্যবহারের কথা ছিল।
কিন্তু অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পের কাজ বাস্তবে কতটা হয়েছে এবং নথিতে দেখানো পরিমাণের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কাজের সামঞ্জস্য কতটুকু—তা নিয়ে বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে। বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর নদীর বিভিন্ন অংশে পলি জমে থাকায় প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুফল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ড্রেজিং দেখানোর অভিযোগ
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পের প্রাক্কলনে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ড্রেজিংয়ের পরিমাণ দেখানো হয়েছিল। দরপত্রে এক্সকাভেটরের মাধ্যমে খননের যে ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল, বাস্তবে তার যথাযথ বাস্তবায়নের প্রমাণ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এ অবস্থায় প্রকল্পের প্রাক্কলন, কার্যাদেশ, পরিমাপ বই, ড্রেজিংয়ের পরিমাণ, মাটি অপসারণের হিসাব এবং বিল পরিশোধের নথি পুনরায় যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
কাজ শেষ না করেই ১৩৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা পরিশোধ?
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন না হলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১৩৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের নথিপত্র সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের জিজ্ঞাসাবাদসহ বিভিন্ন তথ্য যাচাই করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে কতটুকু নদী খনন হয়েছে, কত পরিমাণ মাটি অপসারণ করা হয়েছে এবং কোন প্রক্রিয়ায় বিল অনুমোদন ও পরিশোধ করা হয়েছে—এসব বিষয় অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও অনুসন্ধানের দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় অঙ্কের সরকারি অর্থ ব্যয়ের অভিযোগের নিষ্পত্তি কবে হবে।
নদী খননের আড়ালে বালু বাণিজ্যের অভিযোগ
প্রকল্পকে ঘিরে নদী খননের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন ও বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কার্যাদেশ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো কংস ও ভোগাই নদী থেকে বল্কহেডের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন করে স্থানীয়ভাবে বিক্রি করেছে। এতে একদিকে নদী খননের নামে সরকারি অর্থ ব্যয় হয়েছে, অন্যদিকে উত্তোলিত বালু বিক্রি থেকেও বিপুল অর্থ আয় করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আরও অভিযোগ করা হয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় বিআইডব্লিউটিএর সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা, নির্বাহী প্রকৌশলী, ড্রেজিং বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের একটি অংশের যোগসাজশ থাকতে পারে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
দুদকের হাতে নথি, জিজ্ঞাসাবাদ—তবু মামলা হয়নি
অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, কংস ও ভোগাই নদী খনন প্রকল্পে অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন নথি ও রেকর্ড দুদকের হাতে এসেছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক, বিআইডব্লিউটিএর মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলী এবং দুই নির্বাহী প্রকৌশলীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, অনুসন্ধানে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে অনুসন্ধান চললেও এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান মামলা বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসায় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগেও অনুসন্ধান
প্রকল্পের অনিয়মের পাশাপাশি মো. ছাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে তার স্ত্রী শামিমা আক্তার এবং বিআইডব্লিউটিএর উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. সিরাজুল ইসলাম ভূঁইয়ার সম্পদ নিয়েও দুদকের অনুসন্ধানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২০ সালে সংশ্লিষ্টদের সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে সম্পদ বিবরণী জমা এবং জিজ্ঞাসাবাদও সম্পন্ন হয়। কিন্তু কয়েক বছর পার হলেও অনুসন্ধানের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
আয়কর নথিতে স্বর্ণ বিক্রির তথ্য নিয়েও প্রশ্ন
অভিযোগে ছাইদুর রহমানের আয়কর নথিতে উল্লেখ করা স্বর্ণ বিক্রির মাধ্যমে বিপুল অর্থ প্রাপ্তির তথ্য নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, স্বর্ণ বিক্রির যে রসিদ দেখানো হয়েছে, তার সত্যতা যাচাই প্রয়োজন। এমনকি সংশ্লিষ্ট রসিদে উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট এবং কুড়িগ্রামে বিপুল বিনিয়োগের অভিযোগও তোলা হয়েছে। এসব সম্পদের প্রকৃত উৎস এবং ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—তা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও সামনে
ছাইদুর রহমানের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও অভিযোগে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি বঙ্গবন্ধু পরিষদের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপিপন্থি কর্মকর্তাদের সংগঠনের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—সরকার পরিবর্তনের পরও কীভাবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে বহাল রয়েছেন এবং একই সঙ্গে প্রধান প্রকৌশলী পদে সম্ভাব্য প্রার্থীদের আলোচনায় রয়েছেন?
তবে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও প্রভাব খাটানোর এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন।
প্রধান প্রকৌশলী পদে সম্ভাব্য নিয়োগ ঘিরে প্রশ্ন
বর্তমানে ড্রেজিং বিভাগ থেকে সরিয়ে তাকে ঢাকার প্রকৌশল বিভাগে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পুর) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে বিআইডব্লিউটিএর প্রধান প্রকৌশলী পদে তার সম্ভাব্য নিয়োগ নিয়েও আলোচনা রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, যার বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়ম এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মতো গুরুতর অভিযোগের অনুসন্ধান চলমান, তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে কি না।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগগুলোর বিষয়ে মো. ছাইদুর রহমানের বক্তব্য জানতে তার ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন কল গ্রহণ করেননি।
ফলে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তিনি বক্তব্য দিলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
এখন প্রশ্ন—১৩৪ কোটি টাকার হিসাব কোথায়?
কংস ও ভোগাই নদী খননে ১৩৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ের পরও যদি কাঙ্ক্ষিত নাব্যতা ফিরে না আসে, তাহলে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি কতটুকু ছিল—এ প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
কত ঘনমিটার মাটি অপসারণ করা হয়েছে, কোথায় ফেলা হয়েছে, কত টাকা বিল দেওয়া হয়েছে, প্রকল্পের পরিমাপ কীভাবে যাচাই হয়েছে এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ে প্রত্যাশিত সুফল কেন পাওয়া গেল না—এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অভিযোগ অসত্য হলে সংশ্লিষ্টদের দায়মুক্তি—দুই ক্ষেত্রেই দ্রুত তদন্ত শেষ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলো অভিযোগকারী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্যের ভিত্তিতে তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যত
চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করা হচ্ছে না। দুদকের তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হবে।
