সোমবার, ১৭ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

১৫ বছরেও শেষ হয়নি অনুসন্ধান: চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে ১৭১ চালানে ১৬৩ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
আগস্ট ১৬, ২০২৬ ১১:২১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। ফাইল ফটো

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে ১৭১টি পণ্য চালানে জাল রেকর্ডপত্র, মিথ্যা ঘোষণা ও একই নম্বরে একাধিক বিল অব এন্ট্রি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রায় ১৬৩ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে প্রায় ১৫ বছর ধরে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)সহ তিনটি সরকারি সংস্থা দফায় দফায় তদন্ত করলেও এখনো এর চূড়ান্ত সুরাহা হয়নি। অভিযোগের প্রাথমিক অনুসন্ধানে ৪২ জন আমদানিকারক, ১২ জন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং কয়েকজন কাস্টমস কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

দুদক সূত্রে জানা যায়, একই নম্বরে দুটি বিল অব এন্ট্রি দেখিয়ে এবং ইমপোর্ট জেনারেল ম্যানিফেস্টে (আইজিএম) উচ্চ শুল্কহারের পণ্য ঘোষণা করা হলেও কাস্টমস কর্মকর্তাদের সহায়তায় সেগুলো কম বা শূন্য শুল্কহারে খালাস দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। প্রায় ১৫ বছর আগে চট্টগ্রামের এক ব্যবসায়ী দুদকে অভিযোগটি করেন। অভিযোগের সঙ্গে ১৭১টি চালানের তালিকাও দেওয়া হয়।

অভিযোগে বলা হয়, ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও কিছু কাস্টমস কর্মকর্তা যোগসাজশ করে মিথ্যা ঘোষণা ও জাল কাগজপত্রের ভিত্তিতে এসব চালান শুল্কায়ন করেন। এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতি হয়।

দফায় দফায় তদন্ত, বদলেছে তদন্ত দল

অভিযোগ অনুসন্ধানে ২০১১ সালের ২১ ডিসেম্বর দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক এসএমএম আখতার হামিদ ভূঞাকে টিম লিডার এবং মো. মুজিবুর রহমানকে সদস্য করে দুই সদস্যের দল গঠন করা হয়। ২০১২ সালে উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলমকে দলে যুক্ত করা হয়।

এরপর ২০১৩ সালে উপপরিচালক মো. নাসির উদ্দিনকে টিম লিডার করে চার সদস্যের নতুন দল গঠন করে দুদক। ২০১৮ সালে একই কর্মকর্তাকে টিম লিডার করে পাঁচ সদস্যের আরেকটি অনুসন্ধান দল করা হয়। ওই দল ২০টি মামলার সুপারিশসহ কমিশনে প্রতিবেদন জমা দেয়। কিন্তু এরপর দীর্ঘ সময় বিষয়টি কার্যত থেমে থাকে।

দীর্ঘ বিরতির পর গত বছরের ৮ এপ্রিল দুদকের উপপরিচালক মোজাম্মিল হোসেনকে টিম লিডার করে চার সদস্যের নতুন অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়। বর্তমানে দলটি অভিযোগের অনুসন্ধান করছে।

দুদকের আগেও তদন্ত, শনাক্ত হয়েছিল কর্মকর্তারা

দুদকের আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজও অভিযোগটি তদন্ত করে।

উচ্চ আদালতের আদেশে ২০১১ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন মহাপরিচালক সুলতান মো. ইকবালের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি পরের বছরের ২৪ জুন প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে ৪০ জন রাজস্ব কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করা হয়। রাজস্ব ফাঁকি এবং ১৭১টি নথি গায়েবের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

পরে ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের পক্ষ থেকেও তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। ওই প্রতিবেদনে রাজস্ব ফাঁকির সঙ্গে ৩৬ জন কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের পক্ষ থেকেও অভিযোগটি তদন্ত করা হয়।

নথি যাচাইয়ে বেরিয়ে আসে রাজস্ব ক্ষতির চিত্র

একটি তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংগৃহীত নথিপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ১৭১টি চালানের প্রতিটির রাজস্ব ক্ষতি আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হয়। এজন্য মূল নথি, বিল অব এন্ট্রি, আইজিএম, ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট, বিল অব লেডিং, এলসি, সিআরএফ, ইন্স্যুরেন্স কভার নোটসহ সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পর্যালোচনা করা হয়।

প্রতিবেদনে তৎকালীন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের বিল অব এন্ট্রি প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। সে সময় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা কাস্টম হাউজের বাইরে থেকে অনলাইনে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে রেজিস্ট্রেশন নম্বর নিতেন। এরপর বিল অব এন্ট্রিসহ আমদানি-সংক্রান্ত মূল কাগজপত্র কাস্টম হাউজের নিচতলার সংশ্লিষ্ট শাখায় জমা দেওয়া হতো।

সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারীরা বিল অব এন্ট্রির ডাটাশিটে ‘আইজিএম চেকড অ্যান্ড ফাউন্ড কারেক্ট’ লিখে স্বাক্ষর করতেন। এরপর নথিপত্র পাঠানো হতো রাজস্ব কর্মকর্তার কাছে। রাজস্ব কর্মকর্তারা ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্টে পণ্যের বিবরণ, আমদানিকারকের ঘোষণা, ঘোষিত এইচএস কোড এবং একই ধরনের পণ্যের মূল্য বা রেফারেন্স মূল্য যাচাই করতেন।

সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তারাও ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট, বিল অব লেডিং, এলসি, সিআরএফ, ইন্স্যুরেন্স কভার নোট বা পলিসিসহ সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পরীক্ষা করতেন। প্রয়োজন হলে সংশোধন করে বিল অব এন্ট্রি শুল্কায়নের জন্য পাঠানো হতো।

শেষ ধাপেই ছিল বড় দুর্বলতা

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুল্কায়নের শেষ ধাপেই ছিল সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। সাধারণত বিল অব এন্ট্রিতে দেওয়া ঘোষণা ও সংযুক্ত কাগজপত্রের বিবরণ মিলিয়ে দেখা হলেও ঘোষিত পণ্যের প্রকৃত সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগ ছিল সীমিত। কাগজপত্রে গরমিল ধরা পড়লেই কেবল কায়িক পরীক্ষার সুযোগ থাকত। অন্যথায় আমদানিকারকের ঘোষণার ভিত্তিতেই শুল্কায়ন সম্পন্ন করা হতো।

তবে শুল্ক আইন অনুযায়ী, বিল অব এন্ট্রি রেজিস্ট্রেশনের পর আমদানিসংক্রান্ত সব নথিসহ ডাটাশিট সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্মকর্তার কাছে পাঠানোর বাধ্যবাধকতা ছিল। একই সঙ্গে আইজিএমে ঘোষিত পণ্যের বিবরণ ও পরিমাণ এবং বিল অব এন্ট্রিতে উল্লেখিত পণ্যের বিবরণ ও পরিমাণ সঠিক কি না, তা যাচাই করার দায়িত্বও ছিল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।

আইজিএম গ্রহণ ও সংরক্ষণ করাও ছিল কাস্টমস কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। তাহলে এত বাধ্যতামূলক যাচাই-বাছাইয়ের পরও ১৭১টি চালানে কীভাবে মিথ্যা ঘোষণা, জাল কাগজপত্র ও অসঙ্গত তথ্যের ভিত্তিতে শুল্কায়ন হলো—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।

বিশেষ করে একই নম্বরে দুটি বিল অব এন্ট্রি ব্যবহারের মতো গুরুতর অনিয়ম কীভাবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নজর এড়িয়ে গেল, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ১৭১টি চালানের প্রতিটি নথি ধরে পৃথকভাবে যাচাই করে প্রকৃত রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের পাশাপাশি কোন আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও কাস্টমস কর্মকর্তা কীভাবে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন, তা স্পষ্ট করা জরুরি। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ঝুলে থাকা এই অভিযোগে এবার কার্যকর তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্টদের।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ