রবিবার, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

১৭ বছর একই চেয়ারে আবদুল মান্নান, স্ত্রীসহ পরিবারের নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড়, বদলি-পদোন্নতি বাণিজ্য ও সনদ জালিয়াতির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ ৫:৩৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান কার্যালয়ের প্রশাসন শাখার স্টেনোটাইপিস্ট কাম-কম্পিউটার অপারেটর মো. আবদুল মান্নানের বিরুদ্ধে উঠেছে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ। সনদ জালিয়াতি, পদ-পদবি পরিবর্তন, বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্য, ঘুষ গ্রহণ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ১৭ বছর ধরে এলজিইডি সদর দপ্তরের একই প্রশাসন শাখায় অবস্থান করে আবদুল মান্নান গড়ে তুলেছেন প্রভাবশালী একটি বলয়। দীর্ঘদিন একই গুরুত্বপূর্ণ শাখায় থাকার সুবাদে বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতিসহ প্রশাসনিক বিভিন্ন কাজে তার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও তার সেই প্রভাব কমেনি বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।

শুধু প্রশাসনিক প্রভাব নয়, আবদুল মান্নান ও তার স্ত্রী মর্জিনা খাতুনের নামে-বেনামে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে। উত্তর আজমপুরে ছয়তলা ভবন, জমি, বাড়ি ও কারখানাসহ এসব সম্পদের প্রকৃত উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারী।

সম্প্রতি গোলাম মাওলা নামের এক ব্যক্তি আবদুল মান্নানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে দুদকে লিখিত অভিযোগ করেন। ওই অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নথিপত্রের তথ্যের ভিত্তিতেই এসব অভিযোগ সামনে এসেছে।

তবে অভিযোগগুলোর সবকটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

১৭ বছর একই প্রশাসন শাখায়

সরকারি চাকরিতে একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও আবদুল মান্নানের ক্ষেত্রে সময়ের ব্যবধান যেন আরও দীর্ঘ। অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের ২১ জুলাই তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী মো. ওয়াহিদুর রহমানের সময়ে তিনি এলজিইডি সদর দপ্তরের প্রশাসন শাখায় পদায়ন পান। এরপর প্রায় ১৭ বছর ধরে একই শাখায় দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি।

অভিযোগকারীর দাবি, দীর্ঘদিন সদর দপ্তরে অবস্থানের সুযোগ নিয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি, পদোন্নতি ও পদায়নে আবদুল মান্নান প্রভাব বিস্তার করতেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তার চাহিদামতো অর্থ না দিলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের লিখিত নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট ফাইল আটকে রাখা কিংবা প্রয়োজনীয় নোট না দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

এলজিইডির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রশাসন শাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় একজন কর্মচারী দীর্ঘদিন থাকলে তার হাতে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রভাববলয় তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে। আবদুল মান্নানের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন একই শাখায় থাকার কারণে বদলি-পদায়নসহ প্রশাসনিক বিভিন্ন কাজে তার প্রভাব তৈরি হয়েছে বলে তারা শুনেছেন।

সনদ জালিয়াতি করে পদ পরিবর্তনের অভিযোগ

আবদুল মান্নানের চাকরিতে যোগদান এবং পরবর্তী সময়ে পদ পরিবর্তন নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে দুদকে দেওয়া অভিযোগ।

অভিযোগ অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর বান্দরবানের রুমা উপজেলায় ‘কার্য সহকারী’ পদে যোগ দেন আবদুল মান্নান। পরে শিক্ষা ও কম্পিউটার-সংক্রান্ত সনদ দাখিল করে কথিত জালিয়াতির মাধ্যমে ‘স্টেনোটাইপিস্ট কাম-কম্পিউটার অপারেটর’ পদে পরিবর্তিত হন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীর দাবি, স্টেনোটাইপিস্ট পদে নিয়োগের জন্য ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রির প্রয়োজন হলেও আবদুল মান্নানের জাতীয় পরিচয়পত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) উল্লেখ রয়েছে।

কার্য সহকারী পদ থেকে স্টেনোটাইপিস্ট কাম-কম্পিউটার অপারেটর পদে এ ধরনের পরিবর্তনের আইনগত ও প্রশাসনিক সুযোগ ছিল কি না, সে বিষয়েও তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, কথিত সনদ জালিয়াতির মাধ্যমে উচ্চতর বেতন স্কেল গ্রহণ করে গত ২৫ বছরে সরকারি তহবিল থেকে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা অতিরিক্ত নেওয়া হয়েছে।

বদলি-পদোন্নতিতে কোটি কোটি টাকার লেনদেন?

দুদকে দেওয়া অভিযোগে আবদুল মান্নানের বিরুদ্ধে বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট হারে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, সম্প্রতি প্রায় ২২৫ জন নির্বাহী প্রকৌশলীর পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রত্যেকের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। একইভাবে ১৩৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে সহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রত্যেকের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা, ২৯০ জন উপজেলা প্রকৌশলীর বদলি বা পদায়নে প্রত্যেকের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা এবং ১৯৫ জন উপসহকারী প্রকৌশলীর বদলিতে প্রত্যেকের কাছ থেকে এক লাখ টাকা করে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীর দাবি, এসব হিসাবের ভিত্তিতে বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতিকে ঘিরে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে।

তবে এ ধরনের অর্থ লেনদেনের অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের সত্যতা নিরূপণে সংশ্লিষ্ট নথি, আর্থিক লেনদেন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া তদন্ত করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

উত্তর আজমপুরে ছয়তলা ভবন, জমি ও কারখানা

আবদুল মান্নান ও তার স্ত্রী মর্জিনা খাতুনের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ থাকার অভিযোগও উঠেছে।

দুদকে দেওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকার দক্ষিণখান থানার উত্তর আজমপুরের দেওয়ানবাড়ী রোডের ৩৩ নম্বর হোল্ডিংয়ে ছয়তলা ভবন রয়েছে। ভবনটির মালিকানা, নির্মাণ ব্যয় এবং অর্থের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, দেওয়ানবাড়ী রোডে পাঁচ কাঠার একটি খালি প্লট এবং সাভারের রাজাশনে আরও পাঁচ কাঠা জমি রয়েছে। সিরাজগঞ্জে তার স্ত্রীর নামে ছয়তলা বাড়ি ও প্রায় ৪০ বিঘা জমি থাকার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া গাজীপুরের চান্দুরায় ২০ কাঠা জমির ওপর স্ত্রীর নামে একটি কারখানা এবং সাভারের আশুলিয়ায় ১০ কাঠা জমিসহ টিনশেড বাড়ি থাকার অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীর দাবি, এসব সম্পদের মালিকানা, ক্রয়মূল্য ও অর্থের উৎস অনুসন্ধান করা হলে আবদুল মান্নান ও তার পরিবারের আরও সম্পদের তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।

গৃহিণী স্ত্রীর নামে বিপুল সম্পদ, আয়কর নিয়েও প্রশ্ন

আবদুল মান্নানের স্ত্রী মর্জিনা খাতুনের সম্পদ ও আয়কর নিয়েও অভিযোগে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

অভিযোগে তাকে গৃহিণী হিসেবে উল্লেখ করে দাবি করা হয়েছে, তার নামে বাড়ি, গাড়ি, প্লট, ফ্ল্যাট, জমি ও ব্যাংকে বিপুল অর্থ রয়েছে। তার নামে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) থাকার পাশাপাশি নিয়মিত আয়কর দেওয়ার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীর প্রশ্ন—দৃশ্যমান কোনো নিজস্ব আয়ের উৎস না থাকলে এসব সম্পদ ও অর্থের উৎস কী? এ বিষয়ে আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব ও সম্পত্তির দলিল যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।

ভাইয়ের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ

অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, উত্তর আজমপুরের ছয়তলা ভবনের নিচে ঘুষ ও চাঁদাবাজির অর্থ লেনদেনের সুবিধার্থে আবদুল মান্নান তার এক ভাইকে একটি বিকাশের দোকান দিয়ে বসিয়েছেন।

একই সঙ্গে নিজের ছোট ভাইকে কথিত সনদ জালিয়াতির মাধ্যমে আউটসোর্সিংয়ের অধীনে ‘ইলেকট্রিশিয়ান’ পদে চাকরি দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।

তবে এ অভিযোগের পক্ষেও স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সন্তানদের ব্যয়বহুল পড়াশোনা, ছেলের বিয়েতে ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ

আবদুল মান্নানের বিরুদ্ধে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিলাসী জীবনযাপনের অভিযোগও রয়েছে।

দুদকে দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, তার ছেলে ও মেয়েকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি ও ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (আইইউবি)-তে পড়াশোনা করানো হয়েছে। ছেলের বিয়েতে উত্তরার একটি কমিউনিটি সেন্টারে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত গাড়ি ও দামি মুঠোফোন ব্যবহারের কথাও অভিযোগে বলা হয়েছে।

তবে এসব ব্যয়ের সঙ্গে কথিত অবৈধ আয়ের কোনো সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হয়নি।

দীর্ঘদিন একই চেয়ারে থাকা নিয়ে কর্মকর্তাদের প্রশ্ন

এলজিইডির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রশাসন শাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দীর্ঘদিন একই ব্যক্তি থাকলে বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতিসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে তার প্রভাব তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে। আবদুল মান্নান দীর্ঘদিন একই শাখায় থাকায় তার প্রভাব নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।

এক কর্মকর্তা বলেন, একজন কর্মচারী বছরের পর বছর একই গুরুত্বপূর্ণ শাখায় থাকলে তাকে ঘিরে একটি বলয় তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অভিযোগগুলো সত্য কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করা উচিত।

আরেক কর্মকর্তা বলেন, বদলি ও পদোন্নতির মতো প্রশাসনিক কাজে কোনো কর্মচারীর ব্যক্তিগত প্রভাব থাকার কথা নয়। কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে কর্তৃপক্ষের উচিত নিরপেক্ষ তদন্ত করা।

আবদুল মান্নানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি

আবদুল মান্নানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একাধিকবার তাকে ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

তদন্তের দাবি

অভিযোগকারীরা আবদুল মান্নানের শিক্ষাগত ও কম্পিউটার-সংক্রান্ত সনদ যাচাই, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার প্রশাসনিক বৈধতা খতিয়ে দেখা, তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের প্রকৃত উৎস অনুসন্ধান এবং বদলি-পদোন্নতি ও পদায়নে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

তাদের দাবি, অভিযোগগুলো সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং সরকারি প্রশাসনে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া কথিত প্রভাববলয় ভেঙে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ