সোমবার, ২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

অথরাইজড অফিসার ইলিয়াস-রাফিউলকে ঘিরে ২০ লাখ টাকার কথিত ‘রফাদফা’

নিজস্ব প্রতিবেদক
সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬ ৮:৪৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

মোবাইল কোর্টে মিটার জব্দ, এরপরও নির্মাণকাজ চালু, মিটার ফিরল কীভাবে, প্রশ্ন রাজউকের আইন প্রয়োগ নিয়ে। ফাইল ছবি

রাজধানীর পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের মালাকারটোলায় রাজউকের মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পরও একটি নির্মাণাধীন ভবনে ফের নির্মাণকাজ চলার অভিযোগ উঠেছে। অভিযানের সময় ভবনটির নির্মাণকাজে বিধিবহির্ভূত ব্যত্যয় চিহ্নিত করে আংশিক অপসারণ, বৈদ্যুতিক সার্ভিস লাইন বিচ্ছিন্ন এবং মিটার জব্দ করা হলেও পরবর্তী সময়ে সেই মিটার ফেরত নিয়ে নির্মাণকাজ চালু করার দাবি করেছেন ভবনটির মালিক আমির হোসেন।

আর এখানেই সামনে এসেছে বড় প্রশ্ন—রাজউকের মোবাইল কোর্টে জব্দ করা মিটার কী প্রক্রিয়ায় আবার ভবন মালিকের হাতে ফিরল? কোন অনুমোদন বা আদেশের ভিত্তিতে নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু হলো?

ঘটনাটিকে আরও আলোচনায় এনেছে স্থানীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়া প্রায় ২০ লাখ টাকার কথিত ‘রফাদফা’র অভিযোগ। এ অভিযোগের সঙ্গে রাজউকের ইমারত পরিদর্শক রাফিউল আলম ও অথরাইজড অফিসার ইলিয়াস হোসেনের নামও আলোচনায় এসেছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মোবাইল কোর্টে ব্যত্যয়, জব্দ হয় মিটার

রাজউক জোন-৭/১-এর নথিভুক্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ আগস্ট সূত্রাপুর এলাকায় পরিচালিত মোবাইল কোর্টে ৪, ৫ ও ৬ নম্বর মালাকারটোলা লেনের নির্মাণাধীন ভবনটি পরিদর্শন করা হয়।

অভিযানে ভবনটির ব্যত্যয়কৃত অংশের আংশিক অপসারণ করা হয়। একই সঙ্গে একটি বৈদ্যুতিক সার্ভিস লাইন বিচ্ছিন্ন করে সেটি ডিপিডিসির প্রতিনিধির কাছে হস্তান্তরের তথ্য রয়েছে।

সেদিন মোট ৯টি ভবন পরিদর্শন, ৩টি মিটার জব্দ এবং ৩টি সার্ভিস লাইন বিচ্ছিন্ন করা হলেও সংশ্লিষ্ট নথিতে কোনো জরিমানা আদায়ের তথ্য পাওয়া যায়নি।

তবে যে ভবনে মোবাইল কোর্টে ব্যত্যয় শনাক্ত হয়েছিল, সেই ভবনের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা কী নেওয়া হয়েছিল—এ প্রশ্নেরও সুস্পষ্ট উত্তর মেলেনি।

মিটার গেল কোথায়?

মোবাইল কোর্টের পর নির্মাণকাজ বন্ধ থাকার কথা থাকলেও স্থানীয়ভাবে কিছুদিন পর ওই ভবনে ফের নির্মাণকাজ শুরুর অভিযোগ ওঠে।

ভবন মালিক আমির হোসেনের বক্তব্যে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁর দাবি, রাজউক জব্দ করা মিটার ফেরত দেওয়ার পর তিনি সেটি এনে পুনরায় নির্মাণকাজ শুরু করেছেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—জব্দ করা মিটার ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াটি কী ছিল?

মিটার ফেরত দেওয়ার কোনো লিখিত অনুমোদন, আদালতের আদেশ কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথিভুক্ত সিদ্ধান্ত রয়েছে কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ইলিয়াস বলছেন পুনরায় মোবাইল কোর্টের কথা

রাজউক জোন-৭-এর অথরাইজড অফিসার ইলিয়াস হোসেন জানিয়েছেন, ভবনটিতে একবার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে মিটার জব্দ করা হয়েছিল। ভবন মালিকপক্ষ আবার বিধিবহির্ভূতভাবে নির্মাণকাজ চালালে আইন অনুযায়ী পুনরায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে বলেও তিনি জানান।

অন্যদিকে ইমারত পরিদর্শক রাফিউল আলম মোবাইল কোর্টে অনিয়ম পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তবে মিটার পুনরায় ব্যবহারের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য, এ ক্ষেত্রে আদালতের কোনো আদেশ থাকতে পারে।

তবে আদালতের আদেশ থাকলে সেটির নম্বর, তারিখ এবং বিষয়বস্তু কী—এ প্রশ্নেরও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০ লাখ টাকার কথিত ‘রফাদফা’

মালাকারটোলার এ ভবনকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে প্রায় ২০ লাখ টাকার কথিত ‘রফাদফা’র অভিযোগ।

স্থানীয় পর্যায়ের অভিযোগ, মোবাইল কোর্টের পর ভবনটির বিষয়ে রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথিত সমঝোতা হয়েছে। আর সেই সমঝোতার পরই নির্মাণকাজ ফের চালু হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই অভিযোগের সঙ্গে ইমারত পরিদর্শক রাফিউল আলম এবং অথরাইজড অফিসার ইলিয়াস হোসেনের নামও আলোচনায় এসেছে।

তবে ২০ লাখ টাকার কথিত লেনদেনের বিষয়ে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ বা নথি এ প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। অভিযোগটির স্বাধীন সত্যতা যাচাই প্রয়োজন।

অভিযোগ এলেই মোবাইল কোর্ট—এরপর কী?

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজউকের কর্মকর্তাদের কাছে অবৈধ ভবন নির্মাণের অভিযোগ গেলে অনেক ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। কিন্তু অভিযানের পর কথিত সমঝোতা হলে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা আর দৃশ্যমান থাকে না—এমন অভিযোগও রয়েছে।

এমনকি কোনো কোনো ভবন মালিককে আদালতে রিট করার পরামর্শ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

মালাকারটোলার ঘটনাটি তাই নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—মোবাইল কোর্ট কি শুধু অভিযান ও মিটার জব্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি অভিযানের পরও আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কোনো কার্যকর নজরদারি রয়েছে?

পাশের ভবন ঝুঁকিতে—লিখিত অভিযোগ

ঘটনাটি শুধু নির্মাণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে সীমাবদ্ধ নয়। নির্মাণকাজকে কেন্দ্র করে পাশের ভবনের নিরাপত্তা নিয়েও লিখিত অভিযোগ রয়েছে।

গত ২৩ এপ্রিল রাজউক জোন-৭ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দেন ৬/১ মালাকারটোলা লেনের বাসিন্দা দিলীপ কুমার দাস।

অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, ৪, ৫ ও ৬ নম্বর প্লটে বহুতল ভবন নির্মাণের সময় তাঁদের ভবনের সীমানার একেবারে ঘেঁষে নির্মাণকাজ করা হচ্ছে। এতে তাঁদের ভবন ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

নির্মাণকারী পক্ষ তাঁদের উত্তর দিকের তিনটি দেয়াল এবং পশ্চিম দিকের একটি দেয়ালের অংশবিশেষ ভেঙে ফেলেছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে নির্মাণকাজের শব্দে পরিবারের অসুস্থ সদস্যের শারীরিক অবস্থার অবনতির কথাও উল্লেখ করা হয়।

অর্থাৎ বিষয়টি শুধু নকশা বা সাইডব্যাকের সম্ভাব্য ব্যত্যয়ের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে প্রতিবেশী স্থাপনার নিরাপত্তা ও ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগও যুক্ত হয়েছে।

থানায় জিডি—বিরোধ গড়িয়েছে নিরাপত্তার প্রশ্নে

রাজউকে অভিযোগের পাশাপাশি বিষয়টি থানাতেও গড়িয়েছে।

গত ১০ আগস্ট সূত্রাপুর থানায় করা জিডি নং ৫১৮-তে দিলীপ কুমার দাস কয়েকজনের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ করেন। তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে হুমকিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগও জিডিতে উল্লেখ রয়েছে।

এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই (নিরস্ত্র) মোঃ রাসেল মোল্লা জানিয়েছেন, দুই পক্ষেরই জিডি রয়েছে এবং উভয় পক্ষের জিডি তদন্তাধীন।

প্রশ্ন এখন একাধিক

মালাকারটোলার এ ঘটনায় এখন একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে।

মোবাইল কোর্টে যদি বিধিবহির্ভূত নির্মাণ শনাক্ত হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা কী নেওয়া হয়েছিল?

জব্দ করা মিটার কী প্রক্রিয়ায় ভবন মালিকের হাতে ফিরে গেল?

মিটার ফেরত দেওয়ার কোনো লিখিত অনুমোদন বা আদালতের আদেশ থাকলে তার নথি কোথায়?

নির্মাণকাজ পুনরায় শুরুর অনুমতি কে দিয়েছেন?

আর স্থানীয়ভাবে ওঠা প্রায় ২০ লাখ টাকার কথিত ‘রফাদফা’র অভিযোগের ভিত্তিই বা কী?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মোবাইল কোর্টে অভিযান, মিটার জব্দ ও নির্মাণকাজ বন্ধের পরও যদি একই ভবনে ফের নির্মাণকাজ চলে, তাহলে রাজউকের মাঠপর্যায়ের আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা কোথায় থেমে গেল?

মালাকারটোলার এই ঘটনা তাই এখন শুধু একটি ভবনের নির্মাণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ নয়। এটি রাজউকের মোবাইল কোর্টের কার্যকারিতা, জব্দ করা মিটারের ব্যবস্থাপনা, নির্মাণকাজ পুনরায় চালুর বৈধতা এবং মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—এখন সেই নজর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দিকে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।