হাতে লিফলেট নিয়ে চকরিয়ার পথে পথে ঘুরছেন ডাচ নাগরিক, ভাই পরিচয় দেওয়া ব্যক্তির ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ। ছবি: সংগৃহীত
জন্মের মাত্র দেড় বছর বয়সে দত্তক হয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন সুদূর নেদারল্যান্ডসে। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ৪৫ বছর। শৈশবের স্মৃতি বলতে কিছুই নেই। নেই জন্মদাতা মা-বাবার মুখচ্ছবি কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যদের পরিচয়। শুধু পুরোনো কিছু নথিতে থাকা নাম ও জন্মস্থানের সূত্র ধরে ৪৬ বছর বয়সে আবারও বাংলাদেশের মাটিতে ফিরেছেন সেলিনা গোমেজ। এবার তাঁর একটাই আকাঙ্ক্ষা—খুঁজে পাওয়া জন্মদাতা মা-বাবা ও হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের।
কক্সবাজারের বৃহত্তর উপজেলা চকরিয়ার ডুলাহাজারার মালুমঘাটে জন্ম সেলিনার। দেড় বছর বয়সে একটি ডাচ পরিবার তাঁকে দত্তক নিয়ে নেদারল্যান্ডসে চলে যায়। সেখানেই কেটেছে তাঁর বেড়ে ওঠা ও জীবনের দীর্ঘ সময়। কিন্তু জন্মদাতা পরিবারের পরিচয় জানার আকাঙ্ক্ষা কখনোই মুছে যায়নি। সেই টানেই বারবার বাংলাদেশে আসছেন তিনি। এবারও কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে বিতরণ করছেন পরিবারের সন্ধান চেয়ে তৈরি করা লিফলেট।
৪৬ বছর বয়সী সেলিনা বর্তমানে নেদারল্যান্ডসের নাগরিক। পুরোনো পাসপোর্ট, শৈশবের একটি সাদাকালো ছবি এবং জন্মস্থানসংক্রান্ত কিছু তথ্যই এখন তাঁর পরিবারের সন্ধানের একমাত্র অবলম্বন। এসব সূত্র ধরে সম্ভাব্য এলাকায় খোঁজখবর চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, কোনো না কোনো দিন হয়তো খুঁজে পাবেন সেই মানুষগুলোকে, যাঁদের কাছ থেকে শৈশবেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন।
সেলিনার ভ্রমণ-সহকারী রাসেল আলম জানান, প্রায় সাত-আট বছর আগে প্রথমবার বাংলাদেশে আসেন সেলিনা। এরপর একাধিকবার দেশে এসেছেন। সর্বশেষ গত ২৮ অক্টোবর তিনি বাংলাদেশে আসেন। পরে এক ঘনিষ্ঠজনের মাধ্যমে সেলিনার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। এরপর থেকেই জন্মদাতা পরিবারের সন্ধানে তাঁকে সহযোগিতা করছেন রাসেল।
এদিকে গত শনিবার (৭ নভেম্বর) চকরিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় হাতে লিফলেট নিয়ে ঘুরেছেন সেলিনা। মা-বাবা কিংবা পরিবারের অন্য কোনো সদস্যের সন্ধান পাওয়ার আশায় মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন নিজের পরিচয় ও পুরোনো তথ্য। এরই মধ্যে একজন ব্যক্তি নিজেকে সেলিনার ভাই হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। বিষয়টি নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে তাঁর দীর্ঘদিনের অনুসন্ধানে।
সূত্র জানায়, রোববার (৮ নভেম্বর) ওই ব্যক্তি কক্সবাজার শহরে এসে সেলিনা গোমেজের সঙ্গে দেখা করেন। শহরের একটি তারকা হোটেলে তাঁদের সাক্ষাৎ হয়। এ সময় সেলিনা তাঁর ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করেন। নমুনাটি ঢাকায় নিয়ে পরীক্ষা করার পরিকল্পনা রয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার ফল ইতিবাচক হলে জন্মদাতা পরিবারের সঙ্গে তাঁর রক্তের সম্পর্কের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নিজেকে সেলিনার ভাই হিসেবে পরিচয় দেওয়া ওই ব্যক্তির নাম আবু সৈয়দ। তাঁর বাবার নাম মোহাম্মদ ছাছি মিয়া এবং মায়ের নাম সোনা বানু। তিনি চকরিয়া পৌরসভার চিরিঙ্গা ভরামুহুরী মসজিদপাড়ার বাসিন্দা। আবু সৈয়দের জন্ম ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি। তবে তাঁদের পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়টি ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
সেলিনা গোমেজের কাছে থাকা ভ্রমণসংক্রান্ত পাসপোর্ট ও অন্যান্য কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তাঁর সংগ্রহে রয়েছে শৈশবের একটি সাদাকালো ছবি এবং নেদারল্যান্ডসে যাওয়ার সময়কার পাসপোর্টের ফটোকপি। ওই পাসপোর্টে তাঁর জন্মতারিখ উল্লেখ রয়েছে ১৯৮১ সালের ৭ জুলাই। জাতীয়তা লেখা রয়েছে বাংলাদেশি। পুরোনো এসব নথিই এখন জন্মদাতা পরিবারের পরিচয় খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠেছে।
সেলিনা গোমেজ বলেন, আমি আমার মা-বাবাকে খুঁজছি। তাঁদের খুব মিস করি। তাঁদের মনে করতে পারি না। তবে জানি, আমার বর্তমান মায়ের নাম হেলেনা গোমেজ ও বাবার নাম বেনেডি গোমেজ।
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, ‘নেদারল্যান্ডসে আমি একা অনুভব করি। আশা করি, মা-বাবাসহ আমার পরিবারের সন্ধান পাব।
নিজের জন্ম ও দত্তক হওয়ার ঘটনা প্রসঙ্গে সেলিনা বলেন, ‘আমি জেনেছি, আমার জন্ম মালুমঘাটে। দেড় বছর বয়সে এক নারী আমাকে ঢাকায় নিয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে একটি ডাচ পরিবার আমাকে দত্তক নিয়ে নেদারল্যান্ডসে চলে যায়। ওই দত্তক নেওয়া পরিবারের কাছে আদর-যত্নে বড় হয়েছি।
সেলিনার ভ্রমণ-সহকারী রাসেল আলম বলেন, ‘সেলিনা আরও ১০-১৫ দিন বাংলাদেশে থাকবেন। বর্তমানে কক্সবাজারে অবস্থান করছেন। আমরা একসঙ্গে তাঁর পরিবারের সন্ধান চালিয়ে যাব।
জন্মের পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া পরিবারকে খুঁজতে ৪৬ বছর বয়সে জন্মভূমিতে ফিরে আসা সেলিনার এই আবেগঘন অনুসন্ধান এখন নতুন আশার জন্ম দিয়েছে। ভাই পরিচয় দেওয়া ব্যক্তির ডিএনএ পরীক্ষার ফল কী আসে, সেদিকেই তাকিয়ে আছেন সেলিনা। দীর্ঘ কয়েক দশকের অপেক্ষা শেষে সত্যিই কি মিলবে জন্মদাতা মা-বাবা ও স্বজনদের সন্ধান—সেই উত্তর জানার অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।
