আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী চামান ক্রসিং এলাকায় পাকিস্তানি সেনাদের টহল। শুক্রবার বেলুচিস্তানে। ছবি: এএফপি
সীমান্তে গত কয়েক মাস ধরে চলা বিচ্ছিন্ন সংঘাতের পর পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলো। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে শুক্রবারের হামলাকে ‘সম্মুখ বা প্রকাশ্য যুদ্ধ’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তবে আফগানিস্তান এখনো এমন কোনো ঘোষণা দেয়নি। বৃহস্পতিবার রাতের পর নতুন করে তালেবানের পক্ষ থেকে বড় পরিসরে হামলার খবর পাওয়া যায়নি।
তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার রাতে দুই দেশকে বিভক্তকারী ‘ডুরান্ড লাইন’ বরাবর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যাপক মাত্রায় আক্রমণাত্মক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
আর দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাতে এই সংঘর্ষ প্রায় চার ঘণ্টা ধরে স্থায়ী ছিল। এতে হালকা ও মাঝারি পাল্লার অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, আফগান চিফ অব স্টাফের নির্দেশে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে সামরিক অভিযান বন্ধ করা হয়। অভিযানের নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে।
তবে আফগানিস্তানে অবস্থানরত বার্তা সংস্থা এএফপির এক সাংবাদিক জানিয়েছেন, শুক্রবার সকালে দুই দেশের তোরখাম সীমান্ত ক্রসিংয়ে নতুন করে লড়াই শুরু হয়েছে। রাতের সংঘর্ষের পর কিছু সময় হামলা বন্ধ ছিল। শুক্রবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে তা আবার শুরু হয়। আফগান সৈন্যরা সীমান্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার দাবি করেছেন, তাদের আক্রমণে ১৩৩ আফগান তালেবান যোদ্ধা নিহত হয়েছে। আহত হয়েছেন দুই শতাধিক। অপরদিকে তালেবান সরকার জানিয়েছে, তাদের আটজন যোদ্ধা নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন।
তালেবান আরও দাবি করেছে, তাদের আক্রমণে ৫৫ পাকিস্তানি সেনা নিহত এবং দুটি সামরিক ঘাঁটিসহ ১৯টি চৌকি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে। অপরদিকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন পিটিভি তাদের এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, দেশটির সশস্ত্র বাহিনী গত কয়েক ঘণ্টায় বেশ কিছু তালেবান অবস্থান ধ্বংস করেছে। এর মধ্যে আছে, কান্দাহারে অবস্থিত ব্রিগেড সদর দপ্তর, গোলাবারুদ ডিপো, ওয়ালি খান সেক্টর, শাওয়াল সেক্টর, বাজাউর সেক্টর এবং আঙ্গুর আড্ডা এলাকায় অবস্থিত তালেবান পোস্ট।
পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়নি- পেশোয়ার থেকে শুক্রবার দুপুরে আলজাজিরার সাংবাদিক জানিয়েছেন, পাকিস্তানি বিমান বাহিনী পূর্ণ সক্রিয় অবস্থানে আছে। কাবুল, কান্দাহারসহ অন্যান্য এলাকায় সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করছে।
যেকোনো আন্তঃসীমান্ত হামলার ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষয়ক্ষতির একটি বড় ঝুঁকি থাকে। বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত অনিশ্চিত এবং জটিল। আলজাজিরা বলছে, এখন দেখার বিষয় হলো, এই পাল্টাপাল্টি হামলা কতক্ষণ বজায় থাকে এবং এটি দুই প্রতিবেশীর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয় কিনা।
দুই দেশের মধ্যে এর আগে বড় ধরনের উত্তেজনা দেখা গিয়েছিল গত বছরের অক্টোবরে। তুরস্ক ও কাতারের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও তা অল্প কয়েকদিনের মধ্যে ভেঙে পড়ে।
উত্তেজনার কেন্দ্রে টিটিপি- এই উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি। ইসলামাবাদের অভিযোগ, আফগানিস্তানের তালেবান সরকার টিটিপিসহ পাকিস্তানবিরোধী সন্ত্রাসীদের সমর্থন দিচ্ছে। ইসলামাবাদের একটি মসজিদে সাম্প্রতিক হামলাসহ বিভিন্ন আত্মঘাতী হামলার জন্য এই গোষ্ঠীগুলোকেই দায়ী করে পাকিস্তান। তাদের দাবি, শুক্রবার আফগানিস্তানে তাদের বিমান হামলাগুলো কেবল জঙ্গিদের আস্তানায় চালানো হয়েছে।
তবে তালেবান সরকার এই দাবি অস্বীকার করেছে। তারা বারবার বলে আসছে, আফগানিস্তানের ভূখণ্ড কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে না। তারা উল্টো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে উসকানি বিহীন হামলার অভিযোগ এনেছে।
তালেবানের আমলে ৭৫ সংঘর্ষ- দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার নিরাপত্তা ও কৌশল বিশেষজ্ঞ সামি ওমারি আলজাজিরাকে জানিয়েছেন, ২০২১ সাল থেকে আফগান ও পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে ৭৫ বার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ওই বছরই আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো তাদের বাহিনী প্রত্যাহার করে।
সামি আরও জানান, এই সময়ের মধ্যে পাকিস্তান আফগানিস্তানে ‘নথিবদ্ধ সাতটি বিমান হামলা’ চালিয়েছে। এর মধ্যে শুক্রবারের সর্বশেষ হামলাটিও অন্তর্ভুক্ত।
ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক স্টিমসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া কর্মসূচির পরিচালক এলিজাবেথ থ্রেলকেল্ড বলেছেন, দেশ দুটির মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ আকস্মিক ঘটনা নয়। বরং গত কয়েক মাস ধরে চলা চরম উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ।
থ্রেলকেল্ড বলেন, ‘এর মাঝে আমরা পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বেশ কিছু বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলা হতে দেখেছি। একের পর এক ওই হামলাগুলোর পর দুই দেশের সম্পর্ক তিক্ত হওয়া এবং পরিস্থিতি আবারও সংঘাতের দিকে মোড় নেওয়াতে আমি মোটেও অবাক হইনি।’
