মাত্র ৪৯ হাজার টাকার মাসিক বেতনের সরকারি চাকরি, অথচ সেই বেতনের আড়ালে গড়ে উঠেছে অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদের সাম্রাজ্য—এমন বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED)-এর উপসহকারী প্রকৌশলী একরামুল হক ও তার স্ত্রী শাম্মী আক্তারকে ঘিরে।
কুমিল্লা জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে কর্মরত এই দশম গ্রেডের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ—নিজের ও স্ত্রীর নামে ৫০ কোটিরও বেশি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গড়ে তুলেছেন তিনি।
ইতোমধ্যে বিষয়টি আমলে নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রাথমিক যাচাইয়ে আয়কর নথি ও বাস্তব সম্পদের মধ্যে বড় ধরনের অসংগতি পাওয়ার তথ্যও মিলেছে।
আয়কর নথিতে বড় গরমিল-
অনুসন্ধানে জানা গেছে, একরামুল হকের বাড়ি কুষ্টিয়ায় হলেও তিনি আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন যশোরে, আর তার স্ত্রী শাম্মী আক্তারের আয়কর ফাইল রয়েছে কুষ্টিয়ায়। এখানেও রয়েছে বড় ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত।
কিন্তু আয়কর নথি ঘেঁটে দেখা গেছে— জ্ঞাত আয়ের বাইরে অন্তত ৫০ কোটি টাকার সম্পদের কোনো তথ্যই সেখানে উল্লেখ নেই।
অভিযোগের বিষয়ে একরামুলের দাবি, এসব সম্পত্তি আমার ভাইয়ের। আমার নামে রাখা হয়েছে মাত্র। তবে কেন তার নামে সম্পত্তি—এ প্রশ্নে তিনি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। অন্যদিকে আয়কর নথিতে শাম্মী আক্তারের পেশা “ব্যবসা” লেখা থাকলেও স্থানীয় সূত্র বলছে— তিনি মূলত গৃহিণী।
বসুন্ধরায় ৩০ কোটি টাকার প্লট
সবচেয়ে আলোচিত সম্পদের তালিকায় রয়েছে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ডুমনি মৌজায় ৯.৯০ শতাংশ জমির একটি প্লট।
স্থানীয়দের মতে, ওই এলাকায় প্রতি শতাংশ জমির দাম প্রায় ৩ কোটি টাকা। সেই হিসেবে প্লটটির সম্ভাব্য মূল্য কমপক্ষে ৩০ কোটি টাকা।
নথি অনুযায়ী, গত জানুয়ারি মাসে শাম্মী আক্তার ওই জমির নামজারির আবেদন করেছেন।
তবে একরামুল দম্পতির দাবি—
“বসুন্ধরায় আমাদের কোনো সম্পত্তি নেই।”
কুষ্টিয়ায় বহুতল বাড়ি ও একাধিক জমি
নথিপত্রে দেখা গেছে, কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় নিজের ও স্ত্রীর নামে পাঁচটি জমি কিনেছেন একরামুল।
চৌড়াহাস-২২ মৌজা: ৪.৯১ শতাংশ জমিতে ছয়তলা ভবন — মূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা
ঝালুপাড়া-২৭ মৌজা: প্রায় ৬৬ শতাংশ জমি — মূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা
একই এলাকায় ১.১২৩ শতাংশ জমিসহ একটি ফ্ল্যাট — মূল্য প্রায় ৭০ লাখ টাকা
স্ত্রীর নামে জমির বিস্তার
শাম্মী আক্তারের নামেও কুষ্টিয়ায় রয়েছে একাধিক জমি—
হাটশ হরিপুর-১৮ মৌজা: ১৮.৯৭৫ শতাংশ জমি — প্রায় ৬০ লাখ টাকা
হাজরাহাটি-৫৩ মৌজা: ৪৪.১৬ শতাংশ জমি — প্রায় ৫০ লাখ টাকা
স্থানীয়রা বলছেন, বর্তমান বাজারমূল্য এসবের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।
কৃষিজমি, পান বরজ ও বাগান
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলায় নিজের নামে আরও কয়েকটি জমি কিনেছেন একরামুল।
কেউপুর-৫২ মৌজায় ৫৫ শতাংশ জমিতে পান বরজ — প্রায় ৩০ লাখ টাকা
একই এলাকায় ৫৮.৫০ শতাংশ জমিতে বাগান — প্রায় ৪০ লাখ টাকা
তামাক ক্ষেত ও বিশাল কৃষিজমি
পোড়াদহ হাজরাহাটি বাজার এলাকায় রয়েছে—
একটি দোতলা বাড়ি
চারটি দোকান
এছাড়া হাজরাহাটি-৫৩ মৌজায়—
প্রায় চার বিঘা জমিতে তামাক ক্ষেত — মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা
আরও সাত বিঘা জমি — মূল্য প্রায় আড়াই কোটি টাকা
অতিরিক্ত ৯ বিঘা জমি — মূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা
ব্যাংক হিসাবেও লাখ লাখ টাকা
স্থাবর সম্পদের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংকেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ।
স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক: প্রায় ৩ লাখ টাকা
সোনালী ব্যাংক: প্রায় ২০ লাখ টাকা
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক: প্রায় ৪৩ লাখ টাকা
ডাচ-বাংলা ব্যাংক: প্রায় ২১ লাখ টাকা
অগ্রণী ব্যাংক: প্রায় ৪ লাখ টাকা
দুদকের নজরে ‘অস্বাভাবিক সম্পদ’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একরামুল দম্পতির সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখছে দুর্নীতি দমন কমিশন।
আয়কর নথিতে ঘোষিত আয়ের সঙ্গে বাস্তব সম্পদের অস্বাভাবিক ব্যবধান থাকায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
তদন্তে যদি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের প্রমাণ মেলে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।
