রাজধানীর আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগ—যেখানে নিয়মের বই নাকি এখন শুধু সাজসজ্জা,আর বাস্তবতা চলছে এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায়। অভিযোগ উঠেছে, এখানে গড়ে উঠেছে এক রহস্যময় টেন্ডার সাম্রাজ্য,যার ছায়ানটের মতো ঘুরে বেড়ান বহিরাগত বদিউল আলম সুইট—নিজেকে পরিচয় দেন রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতা হিসেবে, আর নিয়ন্ত্রণ করেন কোটি টাকার খেলা।
অভিযোগের ফাইল খুলতেই‘অন্ধকার রাজ্যের’ চিত্র
সম্প্রতি গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর টেবিলে পৌঁছেছে এক বিস্ফোরক লিখিত অভিযোগ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার সেখানে তুলে ধরেছেন এমন সব তথ্য,যা শুনলে মনে হয়—এ যেন বাস্তবের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কোনো থ্রিলার কাহিনি।
এদিকে ১০% কমিশনের‘প্রবেশদ্বার’- টেন্ডার পেতে চাইলে দিতে হবে ভালোবাসার মূল্য। তার বিরুদ্ধে ওঠা লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, এলটিএম (LTM) পদ্ধতিতে কাজ পাইয়ে দেওয়ার নামে আগেভাগেই দাবি করা হয় প্রাক্কলিত মূল্যের ১০%। এই অর্থ যেন এক ধরনের ‘প্রবেশ টিকিট’—যেখানে সুইট নিজেকে নির্বাহী প্রকৌশলীর ঘনিষ্ঠ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরে ঠিকাদারদের আশ্বাস দেন,আবার অস্বীকৃতি পেলে ঝরে পড়ে হুমকির ছায়া—টেন্ডার বাতিল হয়ে যেতে পারে!
আবার লটারির নামে সাজানো প্রেমের খেলা। আগে থেকেই ঠিক করে রাখেন বিজয়ীর নাম।সরকারি ক্রয় বিধিমালা (PPR) যেন এখানে শুধু নামেই আছে। অভিযোগ অনুযায়ী,পছন্দের ঠিকাদারদের নিয়ে তৈরি হয় গোপন তালিকা। এরপর ‘লটারি’ নামের নাটকে আগেই নির্ধারিত থাকে কে জিতবে,কে হারবে।এই খেলায় সুযোগ পায় কেবল‘বিশ্বস্ত’রা—অন্যরা থাকে বাইরে, অন্ধকারে।
তবে‘সবুজ সংকেত’ছাড়া প্রবেশ নিষেধ!ঠিকাদারদের ভাষায়,সুইটের‘সবুজ সংকেত’ না থাকলে টেন্ডার জমা দেওয়াই যেন নিষিদ্ধ!অবাধে কাজ করতে চাইলে লাগে অনুমতি—আর তা না পেলে নেমে আসে নানা বাধা, ভয়ভীতি, এমনকি অদৃশ্য চাপের দেয়াল।
২৫% পর্যন্ত চাঁদা—ক্ষমতার বিনিময়ে মূল্য- অভিযোগ আরও ভয়ংকর—লাইসেন্স ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার, সমিতির নেতৃত্ব দখল, আর সেই শক্তিতে জোরপূর্বক ২৫% পর্যন্ত অর্থ আদায়! এ যেন শুধু ব্যবসা নয়, বরং এক ধরনের ‘অঘোষিত কর ব্যবস্থা’!
‘ব্ল্যাকলিস্ট’—প্রতিবাদের শাস্তি- কেউ যদি এই চক্রের বিরুদ্ধে কথা বলতে চায়? তাহলেই সামনে আসে ভয়ংকর শব্দ—“ব্ল্যাকলিস্ট”! অডিট, প্রশাসনিক জটিলতা, নানা অজুহাতে কোণঠাসা করে ফেলা হয় প্রতিবাদীদের, এমনটাই দাবি ভুক্তভোগীদের।
দ্বৈত শাসনের অদ্ভুত বাস্তবতা : একাধিক ঠিকাদারের ভাষায়— অফিসের ভেতরে এক ক্ষমতা, বাইরে আরেক ক্ষমতা।ভেতরে প্রশাসনিক কাঠামো, বাইরে প্রভাব ও পেশিশক্তির অদৃশ্য জাল—এই দুইয়ের মাঝে পড়ে সাধারণ ঠিকাদাররা যেন এক অনিশ্চিত প্রেমের গল্পের চরিত্র, যেখানে নিয়ম মানলে হার, আর না মানলে ভয়!
তদন্তের দাবি- নড়েচড়ে বসার সময় এখনই। এই পরিস্থিতিতে ঠিকাদাররা দাবি জানিয়েছেন উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের।লিখিত অভিযোগপত্র ইতোমধ্যে পৌঁছেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের দপ্তরে। এখন তাকিয়ে আছে গোটা অধিদপ্তর জুড়ে ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের বড় একটা অংশ।
উল্লেখ্য যে, স্বচ্ছতার আয়নায় বড় প্রশ্ন প্রতীয়মান। যদি এসব অভিযোগ সত্য হয়, তবে এটি কেবল একটি অফিসের অনিয়ম নয়— এটি পুরো সরকারি টেন্ডার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ওপর এক বড় আঘাত।
তবে এখন সবার চোখ এক জায়গায়— সত্য কি বেরিয়ে আসবে আলোয়, নাকি এই ‘অদৃশ্য সাম্রাজ্য’ আরও গভীরে শিকড় গেড়ে বসবে? নাকি সাধারণ ঠিকাদারদের মুক্তি মিলবে, নাকি পরাধীনতার শিকলে আবদ্ধ থাকবে ঠিকাদার মহল। এমন প্রশ্নের জবাব খুঁজছে নেটিজেনরা
।
