একই কর্মস্থলে প্রায় অর্ধযুগ ধরে দায়িত্ব পালন করছেন রাজশাহীর তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বার্নাবাস হাসদাক। দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগে তার বিরুদ্ধে গড়ে উঠেছে নিজস্ব বলয়। আর সেই বলয়কে ঘিরেই সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, আউটসোর্সিংয়ে পছন্দের লোক নিয়োগ, সরকারি ওষুধ কালোবাজারি, বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মাধ্যমে কমিশন গ্রহণ, মেডিকেল সার্টিফিকেট বাণিজ্য, অ্যাম্বুলেন্স রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি তেলের অর্থ আত্মসাতের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগ নেতার লাইসেন্স ব্যবহার করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীদের নিম্নমানের খাবার সরবরাহের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও তদন্তের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এতে অভিযোগকারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য এবং লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের ১৯ মে তানোর উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগ দেন ডা. বার্নাবাস হাসদাক। এরপর থেকেই তার বিরুদ্ধে একের পর এক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠতে থাকে। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগে তিনি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে একটি প্রভাববলয়ের মাধ্যমে পরিচালনা করছেন।
গত ২২ জুন তানোর উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মফিজ উদ্দিন এবং উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আব্দুল মালেক মন্ডল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর ডা. বার্নাবাসের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৪ আগস্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. নুরুল ইসলাম রাজশাহীর সিভিল সার্জনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটিকে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে এরই মধ্যে ১৮ কর্মদিবস অতিবাহিত হলেও তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীদের দাবি, তদন্ত কমিটির প্রধান রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. এসআইএম রাজিউল করিম তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা করছেন। এতে ডা. বার্নাবাসকে ‘রক্ষা’ করার চেষ্টা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
টেন্ডারে পছন্দের দুই ঠিকাদার?
অভিযোগে বলা হয়েছে, ওষুধ ও সার্জিক্যাল সরঞ্জাম কেনার জন্য ডা. বার্নাবাসের দায়িত্বকালে ছয়টি টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। গত তিন অর্থবছরে ইজিপি টেন্ডারে ঠিকাদার বাবুলের ‘তানভির এন্টারপ্রাইজ’ এবং শফিকুলের শফিকুল হক এন্টারপ্রাইজ’-এর লাইসেন্সের মাধ্যমে ওষুধ ও সার্জিক্যাল সরঞ্জাম সরবরাহের কাজ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রত্যেক অর্থবছরে কোটি টাকার টেন্ডারে ছয় থেকে সাতজন ঠিকাদার অংশ নিলেও বাবুল ও শফিকুল ছাড়া অন্য কেউ কাজ পাননি। ডা. বার্নাবাস ইজিপির গোপন দর বা রেট পছন্দের দুই ঠিকাদারকে জানিয়ে দিয়ে তাদের কাজ পাইয়ে দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জাজ এন্টারপ্রাইজের রোকন উদ্দিন বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমাদের প্রতিষ্ঠান সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল। তারপরও কাজ দেওয়া হয়নি। শফিকুল ও বাবুলকে দেওয়া হয়েছে। ইজিপির গোপন রেট জানিয়ে দিয়ে ডা. বার্নাবাস তার পছন্দের দুই ঠিকাদারকে কাজ দিয়েছেন।
তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ডা. বার্নাবাস। তার ভাষ্য, গোপন রেটের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ ভিত্তিহীন। টেন্ডার কমিটির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
আওয়ামী লীগ নেতার লাইসেন্সে রোগীর খাবার সরবরাহের অভিযোগ
স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি রোগীদের জন্য নির্ধারিত মান ও পরিমাণে খাবার সরবরাহ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, গত দুই অর্থবছর ধরে তানোর পৌরসভা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আতাউর রহমান সরকার ওরফে তারেক সরকারের ‘মেসার্স সরকার এন্টারপ্রাইজ’-এর লাইসেন্স ব্যবহার করে খাদ্য সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করছেন ডা. বার্নাবাস।
রোগীপ্রতি খাবারের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১৭৫ টাকা। অভিযোগকারীদের দাবি, বরাদ্দ অনুযায়ী পুষ্টিকর ও মানসম্মত খাবার সরবরাহ না করে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা আতাউর রহমান সরকার ওরফে তারেক নিম্নমানের খাবার সরবরাহের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অ্যাম্বুলেন্স মেরামত না করেই অর্থ আত্মসাত?
অ্যাম্বুলেন্স রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি তেল খরচ নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। অভিযোগে বলা হয়েছে, অ্যাম্বুলেন্স রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতিবছর এক লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও দুই লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। সাবেক চালক আব্দুস সালামের সহযোগিতায় অ্যাম্বুলেন্স মেরামত না করেই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে অডিট আপত্তি ওঠে। অডিট টিম ঘটনার সত্যতা পাওয়ার পর গত বছরের অক্টোবরে চালক আব্দুস সালামকে তানোর থেকে বদলি করা হয় এবং তাকে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা ডা. বার্নাবাসের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
সরকারি ওষুধ যাচ্ছে নওগাঁর বিভিন্ন ফার্মেসিতে?
দরিদ্র রোগীদের জন্য বরাদ্দ সরকারি ওষুধ যথাযথভাবে বিতরণ না করার অভিযোগও রয়েছে ডা. বার্নাবাসের বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়েছে, সরকারি ওষুধের একটি বড় অংশ তার কথিত লুটপাট সিন্ডিকেটের সদস্য মাহাবুব ও সুমন নামের দুই ব্যক্তির মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী নওগাঁ জেলার মান্দা, নিয়ামতপুর ও মহাদেবপুর উপজেলার বিভিন্ন ফার্মেসিতে বিক্রি করা হয়।
একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীদের বিভিন্ন রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তাদের মাত্র একশ গজ দূরে অবস্থিত সেফা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে কমিশন বাণিজ্য চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
মেডিকেল সার্টিফিকেট নিয়েও বাণিজ্যের অভিযোগ
ডা. বার্নাবাসের বিরুদ্ধে মেডিকেল সার্টিফিকেট বাণিজ্যের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মাহাবুব, সুমন, আগাদা, শেফা ও ববি নামের কয়েকজন ব্যক্তি তাকে এ কাজে সহযোগিতা করেন। তারা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্মচারী না হলেও তাদের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
তানোরের তালন্দ বাজার এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, তার এক নিকটাত্মীয় দুর্বৃত্তদের হামলায় আহত হয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি ছিলেন। মামলা করার জন্য মেডিকেল সার্টিফিকেট প্রয়োজন হলে ডা. বার্নাবাস ১০ হাজার টাকা উৎকোচ নিয়ে সার্টিফিকেট দেন বলে তার অভিযোগ।
সরকারি পুকুরে মাছ চাষ, কোয়ার্টারে থেকেও ভাড়া না দেওয়ার অভিযোগ
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভেতরে প্রায় আড়াই বিঘা আয়তনের একটি পুকুর প্রায় ছয় বছর ধরে লিজ না দিয়ে নিজেই মাছ চাষ করে অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগও রয়েছে ডা. বার্নাবাসের বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২১ সাল থেকে সরকারি কোয়ার্টারে বসবাস করলেও তার বেতন থেকে নিয়ম অনুযায়ী বাসাভাড়া কর্তন করা হয় না।
‘দুর্নীতির কারণে দরিদ্র রোগীরা সেবা থেকে বঞ্চিত’
অভিযোগকারী তানোর উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আব্দুল মালেক মন্ডল বলেন, ‘ডা. বার্নাবাসের দুর্নীতির কারণে দরিদ্র সেবাপ্রার্থীরা যথাযথ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। তিনি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘তদন্ত কমিটির প্রধান রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. বার্নাবাসের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো সরেজমিন তদন্তের জন্য গত ১৬ সেপ্টেম্বর তানোর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সকালে যাওয়ার জন্য আমাদের চিঠি ইস্যু করেন। কিন্তু তিনি আসেননি। রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. বার্নাবাসকে রক্ষার চেষ্টা করছেন।
তদন্তে সময় বাড়ানোর আবেদন করবেন সিভিল সার্জন
তদন্তে বিলম্বের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. এসআইএম রাজিউল করিম বলেন, সরেজমিন তদন্তের জন্য গত ১৬ সেপ্টেম্বর যাওয়ার কথা থাকলেও দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকায় তিনি যেতে পারেননি। তদন্তকাজে সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন করবেন বলেও জানান তিনি।
ডা. বার্নাবাসকে ‘রক্ষার’ অভিযোগ সম্পর্কে সিভিল সার্জন বলেন, ‘এটা কেউ বলতে পারে, কিন্তু আমরা যথাযথ তদন্ত করব।
অন্যদিকে ডা. বার্নাবাস হাসদাক তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অ্যাম্বুলেন্স রক্ষণাবেক্ষণ, পুকুর লিজ না দেওয়া, কমিশন ও সার্টিফিকেট বাণিজ্যসহ অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এসব বিষয়ে কথা বলব না। তথ্য চাইলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন করে তথ্য নিতে হবে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই হলেই ডা. বার্নাবাস হাসদাকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
